No icon

সরকারের মিথ্যা উন্নয়নের মহামারীর কবলে বাংলাদেশ!

বিদেশি বিনিয়োগ ১২৮ কোটি ডলার বেশি দেখাচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ব্যাংক-আঙ্কটাডের তথ্যে অমিল

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রাক্কলনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হিসাব মিলছে না। এবার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) হিসাব নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) এফডিআই হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে।

যদিও এর আগে কখনোই এমনটি হয়নি। প্রতি বছরই আঙ্কটাড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এফডিআইয়ের হিসাব একই ছিল। তবে এবার (২০১৯ সালের হিসাবে) প্রায় এক দশমিক ২৮ বিলিয়ন (১২৮ কোটি) ডলার এফডিআই বেশি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ এর গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি সংস্থাটি।

সূত্রমতে, বিশ্বব্যাপী বিদেশি বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রতি বছর প্রকাশ করে আঙ্কটাড। এছাড়া এফডিআই নিয়ে প্রতিটি দেশের নিজস্ব হিসাবও রয়েছে। তবে এ দুই হিসাব সাধারণত সমান হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এ বছর আঙ্কটাডের হিসাবে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ এফডিআই কমেছে। তাই এ বছর এফডিআইয়ের হিসাবে অস্বাভাবিক ব্যবধানের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা খুঁজে বের করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যমতে, গত ১৬ জুন বিশ্বব্যাপী ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট, ২০২০’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে আঙ্কটাড। এতে দেখা যায়, করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) আঘাত হানার আগেই অর্থাৎ ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ কমেছে রেকর্ড ৫৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। এতে গত বছর বাংলাদেশে এফডিআই আসে প্রায় এক দশমিক ৫৯৭ বিলিয়ন (প্রায় ১৬০ কোটি) ডলার।

আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে দুই দশমিক ৮৭৪ বিলিয়ন (প্রায় ২৮৭ কোটি) ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক ও আঙ্কটাডের হিসাবে পার্থক্য এক দশমিক ২৭৭ বিলিয়ন (প্রায় ১২৮ কোটি) ডলার। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। গত এপ্রিলে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এ হিসাবে ২০১৯ সালে দেশে এফডিআই কমেছে ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে দুই দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। এটিই বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য। আমরা যা পেয়েছি, তা উল্লেখ করলাম। আঙ্কটাড এ তথ্য কোথা থেকে পেল তারাই বলতে পারবে।’

বিষয়টি জানতে আঙ্কটাডের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটির ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ বিভাগের ইনভেস্টমেন্ট ইস্যুস অ্যানালাইসিস ব্র্যাঞ্চের অধীন ইনভেস্টমেন্ট ট্রেন্ডস অ্যান্ড ডেটা সেকশনের প্রধান অ্যাস্ট্রিট সুলস্তারোভা শেয়ার বিজকে জানান, ‘দুর্ভাগ্যবশত যখন আমরা ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২০-এর তথ্য চূড়ান্ত করি তখন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাত্র তিন প্রান্তিকের তথ্য প্রদান করে। এজন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক তথ্য ব্যবহার করা হয়।’

তিনি আরও জানান, ‘আমি উল্লেখ করতে চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এফডিআইয়ের ডেটা নিয়মিত সংশোধন ও হালনাগাদ করে থাকে।’

আঙ্কটাডের এ মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এফডিআইয়ের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই সংগ্রহ করে আইএমএফ। তাই আইএমএফের তথ্য ভুল হওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যে কোনো গরমিল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল তিন দশমিক ৬১৩ বিলিয়ন (৩৬১ কোটি) ডলার। আঙ্কটাড ও বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়ের হিসাবেই এ তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল সর্বোচ্চ এফডিআই প্রবাহ। এছাড়া ২০১৭ সালে দুই দশমিক ১৫২ বিলিয়ন, ২০১৬ সালে দুই দশমিক ৩৩৩ বিলিয়ন, ২০১৫ সালে দুই দশমিক ২৩৫ বিলিয়ন ও ২০১৪ সালে এক দশমিক ৫৫১ বিলিয়ন ডলার এফডিআই আসে বাংলাদেশে। প্রতিবারই আঙ্কটাড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।

এদিকে এ বছর শুধু এফডিআই প্রবাহ নয়, এফডিআই স্টকের হিসাবেও আঙ্কটাড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। আঙ্কটাডের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশে এফডিআই স্টক কমে গেছে। গত বছর শেষে এফডিআই স্টক দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০১৮ সাল শেষে এফডিআই স্টক ছিল ১৭ দশমিক ০৬২ বিলিয়ন ডলার।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৯ সালে এফডিআই স্টক বেড়েছে। এতে দেখা যায়, গত বছর শেষে দেশে এফডিআই স্টক দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৭৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০১৮ সালে যা ছিল ১৭ দশমিক ০৬২ বিলিয়ন ডলার। এর আগে কোনো বছরই এফডিআই স্টকের তথ্যেও গরমিল হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এফডিআইয়ের হিসাবের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বেই আঙ্কটাডের তথ্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহƒত হয়। এ তথ্যই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। আর বাংলাদেশে কখনও আঙ্কটাডের হিসাবের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের গরমিল হয়নি। তবে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ এফডিআই কমল আর এ বছরই তথ্যে গরমিল দেখা দিল বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা।

আর আঙ্কটাড যদি ভুল করে থাকে তাহলে তাদের কাছে প্রমাণসহ প্রতিবাদ প্রেরণ ও এফডিআইয়ের হিসাব সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ভুল বার্তা যেতে পারে।

Comment As:

Comment (0)