No icon

আওয়ামী স্বৈরাচার ও ভারতীয় আগ্রাসন

করোনাকালে বাংলাদেশ, থমকে গেছে সবাই। কিন্তু থেমে আওয়ামী স্বৈরাচারের দূর্নীতি। চাল থেকে চিকিৎসা সব জায়গায় আওয়ামী চোরদের সরব উপস্থিত। বাংলাদেশের একটি বিলুপ্ত নিকৃষ্ট প্রাণীর আওয়ামী লীগ। ওরা যেন কোনো কিছুতেই হার মানছে না। ২০০৯ সালে ভারতীয় 'র' এর সাথে গোলামীর চুক্তি করে সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে ধ্বংস করে ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ। এর পরে থেকেই বাপের স্বপ্ন পূরণ করতে ভারতীয় গোলামী করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। আজব সংস্কৃতি তৈরি করে রেখেছে আওয়ামী লীগ ১৭ কোটি মানুষ ভোট একজনকে আর রাতের আঁধারে বিজয়ী হয়ে অন্য দল। লুটেপুটে খেয়ে দুর্নীতির অভয়ারণ্য বানিয়ে রেখেছে। সংসদ যেন যাত্রার মঞ্চ। এ যেন ভারতীয় অদৃশ্য অঙ্গ রাজ্য করে রেখেছে বাংলাদেশকে। এসব বিষয় নিয়েই আজকের লেখা। যদি ধৈর্য ও সময় থাকে তাহলে পড়তে পারেন। কারণ লেখাটা আপনার জন্যই

তাহলে শুরু করা যাক....

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দিল্লির ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকশ্র্রেণি সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং চানক্যনীতি ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত তিনটি ভূখন্ড ভারতীয় ইউনিয়নভূক্ত করেছে। এই তিনটির মধ্যে কাশ্মীর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, হায়দারাবাদ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সিকিম বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৯৪৮ সালে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং নেহরু পরিবারের বিশেষ বন্ধু লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কারসাজিতে ভারতভূক্তির দলিলে সই করলে দিল্লির সেনাবাহিনী ভূস্বর্গ নামে বিশ্বে পরিচিত উপত্যকাটি দখল করে নেয়। সেই থেকে স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরীদের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম বিরামহীনভাবে চলছে। হায়দারাবাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ঠিক কাশ্মীরের বিপরীত। সেখানে মুসলমান নিজাম রাজ পরিবার শাসন করতো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে। ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বি-জাতি তত্ত্বের নীতি অনুসরন করেই হায়দারাবাদে সামরিক অভিযান চালায়। নিজামের ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর পক্ষে শক্তিধর দিল্লিকে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। ভারতীয় শাসকশ্রেণির চিরাচরিত অনৈতিক আচরন অনুধাবনের জন্য কাশ্মীর এবং হায়দারাবাদের ইতিহাস জানাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। যে কোন যুক্তিবাদী মানুষই নিশ্চয়ই মেনে নেবেন যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি হায়দারাবাদের ভারতভূক্তিকে যৌক্তিকতা এবং আইনগত বৈধতা দেয়, তাহলে মুসলামান সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কাশ্মীরের অবশ্যই পাকিস্তানের অংশ হওয়া উচিৎ ছিল। দূর্ভাগ্যবশত: বীরভোগ্যা বসুন্ধরায় ন্যায়-নীতির কোন জায়গা নেই। পাকিস্তান একে তো ভারতের তুলনায় হীনবল, তার উপর মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দু, খ্রীষ্টান এবং ইহুদী ধর্মেগাষ্ঠী সর্বদাই ঐক্যবদ্ধ। যে কারনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৮ সালে কাশ্মীরীদের আত্বনিয়ন্ত্রনের অধিকারকে বৈধতা দিয়ে প্রস্তাব গৃহিত হলেও আজ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। কাজেই পারমানবিক শক্তিধর হলেও পাকিস্তানের পক্ষে কাশ্মীরী জনগনকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা এক দু:সাধ্য কাজ।

১৯৭৫ সালে সিকিমকে গিলে ফেলতে অবশ্য দিল্লিকে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হয়নি। সেখানে চানক্যের কূট-কৌশলেই বাজিমাত হয়েছে। দিল্লির নির্দেশক্রমে সিকিমের দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক লেন্দুপ দোর্জি সংসদে বিল পাশের মাধ্যমে দেশটির স্বাধীনতার স্বেচ্ছা অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় পতাকা গ্রহন করেন। কথিত আছে যে, ১৯৭৫ সালে তৎকালিন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ইঙ্গিতে সিকিমের রাজার (চোগিয়াল) পালদেন থনডুপ নামগিয়ালের (Palden Thondup Namgyal) বিরুদ্ধে দোর্জির সিকিম কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহের আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে সাধারন পোষাকে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়মিত অংশ নিত। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের কাছে লেন্দুপ দোর্জি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তেজপাল সেন (Tajpal Sen) নামের একজন ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাকে নিয়মিত অর্থ প্রদান করতো। সিকিমের ভারতভূক্তি সম্পন্ন হলে লেন্দুপ দোর্জি ভারতের নতুন রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর পদ গ্রহন করেন। নিজের দেশে আমৃত্যু বিশ্বাসঘাতক নামে অভিহিত দোর্জিকে ভারত সরকার ২০০২ সালে সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্ম বিভূষন’ প্রদান করে। বাংলাদেশের চিহ্নিত ভারতীয় দালাল বুদ্ধিজীবি সুশীলদেরও সাম্প্রতিক সময়ে দোর্জির মতই নানারকম খেতাবে ভূষিত করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সাল পরবর্তী সময়ে দিল্লির দখল করে নেয়া তিনটি ভূখন্ডের মধ্যে হায়দারাবাদ এবং সিকিমের ভারতীয়করন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় দেশদুটিতে স্বাধীনতার আকাঙ্খার সম্পূর্ন ভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলা যায়। অবশ্য চীন সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ার কারনে সিকিম নিয়ে দিল্লির খানিকটা মাথাব্যথা হয়তো থেকেই যাবে। কিন্তু, কাশ্মীরে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে গনহত্যা চালিয়েও স্বাধীনতাকামী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মুক্তিসংগ্রামকে দিল্লি আজ পর্যন্ত পরাভূত করতে সক্ষম হয়নি। কাজেই কাশ্মীর নিয়ে কোন চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি।

১৯৭৫ সালে সিকিম দখলের পর দিল্লির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন এবং তাৎপর্য্যময় সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয়লাভের জন্য তিন দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। হায়দারাবাদের ভৌগলিক সীমানা ভারতের অভ্যন্তরে হওয়ায় সেই ভূখন্ড দখলের সামরিক কৌশলগত মূল্য তেমন বেশি নয়। সিকিম চীন সংলগ্ন হওয়ার কারনে সামরিকভাবে অধিকতর গুরুত্বপূর্র্ণ। হায়দারাবাদ এবং সিকিমের চেয়ে কাশ্মীরের গুরুত্ব অবশ্যই অনেক বেশি। আলোচিত তিনটি ভূখন্ডের জনগনের মধ্যে ধর্মবিশ্বাসের বিবেচনায় কাশ্মীর ভারতের জন্য সর্বোচ্চ সামরিক ঝুঁকির কারন হতে পারে। তবে সেখানেও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এক কোটির উর্ধ্বে নয়। ২০২০ সালে এসে বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রটিকে ভারত করায়ত্ত করেছে তার মোট জনসংখ্যা সাড়ে ষোল কোটির মধ্যে প্রায় পনেরো কোটিই মুসলমান, শতকরা হিসেবে নব্বই। আরো তাৎপর্য্যপূর্ন বিষয় হচ্ছে যে, এই বিপুল ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করতে দিল্লিকে কোন সামরিক অভিযান চালাতে হয়নি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ নয়। ২০১৮ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরাজয়ের সাথে ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে মুষ্টিমেয় বিজয়ী ইংরেজ বাহিনী যখন রাজধানী মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করছিল তখন ক্ষেতে-খামারে কর্মরত চাষীরা এবং সাধারন জনতা নির্লিপ্তভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সাড়ে পাঁচশ বছরের মুসলিম শাসনের অবসানের সাথে দেশের মালিকানাও যে বিদেশীদের হাতে চলে গেছে সে সম্পর্কে কোন চেতনাবোধ সেদিন সাধারন জনগনের মধ্যে বিশেষভাবে জাগ্রত হয়েছিল তার কোন প্রমান ইতিহাসের বই ঘেটে পাওয়া যায় না। বরঞ্চ বিজয়ী ইংরেজ সেনাপতিদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের স্মৃতিকথায় লিখে গেছেন যে, সেদিন মুর্শিদাবাদের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো হাজার তিনেক ইংরেজ সৈন্যদের দিকে যদি ঢিলও ছুঁড়ে মারতো তাহলে তাদের কেউ হয়তো নব্যলব্ধ বাংলা শাসন করার জন্য জীবিত থাকতো না। মুসলিম শাসকদের সাথে দেশবাসীর সম্পর্কের মধ্যে কেন এই বিষ্ময়কর দূরত্ব তৈরী হয়েছিল সেই আলোচনা আমার বর্তমান লেখার বিষয় নয়। আমি কেবল স্মরন করিয়ে দিতে চাচ্ছি যে, ভারতবর্ষের মুসলমানদের একটি স্বাধীন আবাসভূমি ফিরে পেতে পলাশীর ট্রাজেডী পরবর্তী ১৯০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

বাংলার স্বাধীনতা ১৭৫৭ সালে নির্বাপিত হওয়ার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হতে বছর পাঁচেক সময় লেগেছিল। সিরাজের বিশ্বাসঘাতক সেনাপ্রধান মীরজাফরের জামাতা নবাব মীর কাসিম বাংলার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম শুরু করেছিলেন ১৭৬১ সালে। মীর কাসিম তার সংগ্রামে সফল হননি। কিন্তু, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রধানত: ভারতের মুসলমান জনগোষ্ঠী প্রায় একশ বছর ধরে লড়াই অব্যাহত রেখেছিল। এই বাংলা ভূখন্ডেই তো কত বীরের নাম আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়েছি। ফকির মজনু শাহ, মুসা শাহ, শমশের গাজী, আবু তোরাব, ফকির করম শাহ, নুরুল দীন, ফকির বোলাকী শাহ, হাজী শরিয়ত উল্যাহ, দুদু মিঞা, নিসার আলী তীতুমির, রজব আলী এবং আরো কত হারিয়ে যাওয়া নাম। আজ বাংলাদেশে যতবার একজন সূর্য সেন অথবা একজন প্রীতিলতার নাম উচ্চারিত হয় তার শত ভাগের একভাগও এইসব মুসলমান ধর্মাবলম্বী দেশপ্রেমিক বীরদের ভাগ্যে জোটে না। ব্রাহ্মন্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এভাবেই আমাদের জীবন থেকে নিজম্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি, স্বকীয়তা কেড়ে নিয়ে এ দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানকে আত্ব পরিচয়ের সংকটে নিপতিত করেছে। এই ভূখন্ডে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূচনা করতে হলে আমাদের বাঙালি মুসলমানের পরিচয়টি স্বগর্বে ঘোষনা করতে হবে। দিল্লির আশির্বাদপুষ্ট ক্ষমতাসীন দালালগোষ্ঠীর বাঙালিত্ব নিয়ে অতি প্রচারের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে এদেশের নব্বই শতাংশ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে বিলীন করে দেয়া।

বিশ্বের যে কোন স্থানেই মুক্তিসংগ্রামের কৌশল সার্বিক ভৌগলিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের ভৌগলিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষনের আগে আমাদের কাশ্মীরের দিকে আর একবার তাকানোর আবশ্যকতা রয়েছে। কাশ্মীরের সাথে ভারতের দুই ক্ষমতাধর শত্রু রাষ্ট্র চীন এবং পাকিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। সুতরাং কাশ্মীরের মুক্তিসংগ্রামীদের কাছে প্রয়োজনীয় সরবরাহ (Logistic Supply) সীমান্তের ওপার থেকে আসার যথেষ্ট সুযোগ আছে। বেকায়দায় পড়লে সীমান্ত পার হয়ে সাময়িক আশ্রয় গ্রহন করাও সেদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে সম্ভব। এই কারনেই কাশ্মীরে শেখ আবদুল্লাহ এবং মুফতী সাইদ পরিবারের নেতৃত্বাধীন দিল্লিপন্থী দালাল রাজনৈতিক দলগুলোর কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতীয় দখল বজায় রাখার কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মুক্তিকামী মানুষের সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট নিয়ে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য উল্লিখিত দুই পরিবারের বংশধররা নীতি-নৈতিকতা, দেশপ্রেম, আত্মসম্মান জলাঞ্জলী দিয়ে সুবিধা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ভারতীয় কংগ্রেস অথবা বিজেপির কোলে আশ্রয় নিচ্ছে। এই সব তাবেদার জনবিচ্ছিন্ন নেতারা সর্বরকম কূটকৌশল প্রয়োগ করেও কাশ্মীরের আপামর জনগনের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে নির্বাপিত করতে পারেনি। সেখানকার লড়াকু তরুন-তরুনী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। পরিনামে তাদের অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেেত হচ্ছে। ছয় লাখেরও অধিক ভারতীয় সৈন্যরা কাশ্মীরের জনগনের উপর যে গনহত্যা এবং পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে তার সঙ্গে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের উপর পাকিস্তানীদের বর্বর আচরনের তুলনা চলে।

কাশ্মীরের জনগনের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস আজকের আধিপত্যবাদ কবলিত বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। কাশ্মীর উপত্যকার ভৌগলিক অবস্থানের সঙ্গে আমাদের দেশটির কোন মিল না থাকলেও ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক অবস্থার সামঞ্জস্য রয়েছে। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ প্রায় সম্পূর্নভাবেই ভারতবেষ্টিত। মিয়ানমারের সাথে আমাদের ক্ষুদ্র সীমান্তসংযোগ থাকলেও কোন জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে সেই সীমান্তের তেমন কোন কৌশলগত গুরুত্ব নেই। তদুপরি সে দেশে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের উপর উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের চলমান সহিংসতাকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে বৈরিতার সম্পর্ক রয়েছে। অতএব ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এ দেশের জনগনকে বিদেশের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার উপরেই প্রধানত: নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ সেই পাকিস্তানী আমল থেকেই দিল্লির শাসকশ্রেণির সঙ্গে পোষক-গ্রহীতা (Client-Patron) সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির টিকিও সেই দিল্লিতেই বাঁধা আছে। এদেশের অধিকাংশ বাম দলের রাজনৈতিক চরিত্রগত ইসলাম বিদ্বেষের কারনে তারাও দিল্লির আদর্শিক মিত্র। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কার্যকলাপের দায় এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ইসলাম ফোবিয়ার মিলিত বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে কোন জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়। দলটির সাম্প্রতিক কার্যকলাপদৃষ্টে সঙ্গতকারনেই মনে হতে পারে যে, তারাও ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের সাথে দেন-দরবারের মাধ্যমে খানিকটা রাজনৈতিক জায়গা (Political Space) নিতেই অধিকতর সচেষ্ট। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের অতি উৎসাহ দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ওই প্রকার কৌশল গ্রহনেরই ইঙ্গিত প্রদান করে। অবশ্য জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের কর্মী ও বিএনপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কর্মীদের মধ্যে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনা যথেষ্ট প্রবল বলেই মনে হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য ইসলামিক দলগুলো ইসলামের নানারকম ব্যাখ্যা নিয়ে বহুধাবিভক্ত। উপরন্তু, আমাদের আলেম সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের উপর ভারতের দেওবন্দ এবং কংগ্রেসের সহযোগী জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের প্রভাব থাকায় জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে তাদের সর্বাত্মক অংশগ্রহন নিয়ে সংশয় রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে একমাত্র শহীদ জিয়াই এ দেশের জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। অতএব তার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বিএনপির মধ্যেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার নৈতিক বল এবং যোগ্যতা ছিল। কিন্তু, সাম্প্রতিককালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মিথ্যা মামলার রায় ও পরবর্তীকালে অযোগ্য নেতৃত্ব এবং দিল্লির কাছে দলটির নেতৃত্বের অসহায় আত্মসমর্পনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির চরিত্র এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন এবং তর্ক-বিতর্কের সময় উপস্থিত হয়েছে।

এবার সামাজিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। একটি রাষ্ট্রে বুর্জোয়া অর্থব্যবস্থার অধীনে যে উচ্চবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ওই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি জরুরী উপাদান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান এবং ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভারতীয় বুর্জোয়া গোষ্ঠীর মধ্যেই অধিকতর জাতীয়তাবাদী চেতনা লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে এমন একটি জাতীয় বুর্জোয়ার উত্থান ঘটেছিল যারা ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্পূর্ন অনুগত থেকেই মুনাফা এবং মুলধন সৃষ্টিতে আগ্রহী ছিল । বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় ভারত অথবা পাকিস্তানের সাথে তুলনীয় কোন বুর্জোয়া গোষ্ঠীর অস্তিত্ব এখানে ছিল না বললেই চলে। বিগত ৪৭ বছরে পোষাক রপ্তানী, আবাসন, খাদ্য, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য শিল্পখাতনির্ভর একটি বুর্জোয়া শ্রেণি এদেশেও গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই আবার বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ন্ত্রন করে থাকে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের বুর্জোয়া গোষ্ঠী প্রধানত: জাতীয়তাবাদ বিবর্জিত, অতি মুনাফালোভী একটি পরজীবি শ্রেণি চরিত্র লাভ করেছে। তাই আধিপত্যবাদের বিপদ কিংবা দেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে এদের অধিকাংশই সম্পূর্নভাবে উদাসীন। ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়েও তাদের তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। অতএব জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে এদের সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এরপর মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। অতি আধুনিক সেক্যুলার নাগরিক মধ্যবিত্ত এবং মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সেই ষাটের দশক থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক মধ্যবিত্তদের মধ্যে ভারতপ্রীতি ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করলেও মফস্বল এবং গ্রামের মধ্যবিত্ত সমাজ আজও বাঙালী মুসলমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেই মফস্বল এবং গ্রাম থেকেই অধিক সংখ্যায় জনগন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল এবং জনযুদ্ধে সার্বিক সহযোগিতাও প্রদান করেছে। কিন্তু, এই শ্রেণি কখনই ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির মধ্যে বিলুপ্ত হতে চায়নি। পাকিস্তানী জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে তারা ইসলামের আলোকেই মূল্যায়ন করেছে। তাই পাকিস্তান ভেঙে বাংরাদেশ হলেও, বাঙালী মুসলমানের স্বতন্ত্র এবং গৌরবজ্জল আত্মপরিচয় উপরোক্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনও বিস্মৃত হয়নি। উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের বাইরে বাংলাদেশের যে সংখ্যাগিরিষ্ঠ গ্রামীন ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন ধারাকে আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এখনও গ্রাস করতে পারেনি। সেই জন্যেই নৌকা অথবা ধানের শীষ, যে মার্কাতেই তারা ভোট দিক না কেন, জুমার নামাজে কিন্তু, সকলেই পরিস্কার কাপড় পড়ে এবং মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে উপস্থিত হয়। এলাকায় মসজিদ অথবা মাদ্রাসার উন্নয়নে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির বিভাজন সচরাচর থাকে না। পরিবারে নতুন শিশুর আগমন ঘটলে তারা আজান দেয়, দোয়ার জন্য দৌড়ে যায় ইমাম সাহেবের কাছে। এটাই বাংলাদেশের নব্বই শতাংশ জনগনের সংস্কৃতি। আমাদের দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রয়েছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় আরও দুটি ক্ষুদ্র এবং বিশেষ গোষ্ঠীকে অগ্রাহ্য করা যাবে না।

এদেশে আনুষ্ঠানিক সুশীল সমাজের উৎপত্তি নব্বইয়ের দশকে। অনেক রাষ্ট্রেই সুশীল সমাজ সরকারের উপর বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে। এর ফলে সে সব রাষ্ট্রে সুশাসনের পথ প্রশস্ত হয়। দূর্ভাগ্যজনক ভাবে বাংলাদেশের সুশীল সমাজের অতি মাত্রায় বিদেশ নির্ভরতা দেশটির সার্বভৌমত্বকে দূর্বল করেছে। বিশেষ করে এক এগারো পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ভূমিকা ট্রয়ের ঘোড়ার অনুরূপ ছিল। এদের উপর সওয়ার হয়েই বাংলাদেশে ইন্দো-মার্কিন আধিপত্যবাদ ঘাটি গেড়েছে। ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট শাসকশ্রেণি উল্লেখিত ভারতপন্থী সুশীল সমাজ দ্বারা বিপুলভাবে উপকৃত হওয়া সত্ত্বেও বিগত এক দশকে এক সময়ের সেই মিত্রদের মধ্যে যথেষ্ট অবিশ্বাস এবং দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের উপর তার পারিবারিক দখলদারিত্ব চিরস্থায়ী করার মিশনে বর্তমানে সুশীল সমাজকে বাধা হিসেবেই বিবেচনা করছেন। দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সাথে সুশীল সমাজের নৈকট্য শেখ হাসিনাকে উদ্বিগ্ন এবং সন্দিহান করে তুলেছে। বিশেষ করে প্রফেসর ইউনুস, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের প্রতি তার বিদ্বেষ সেই সন্দেহ থেকেই উদ্ভূত। অতীতে এই বিশেষ গোষ্ঠী কখনও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং বাঙালী মুসলমানের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির পক্ষে অবস্থান নেয়নি। বরঞ্চ স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে তারা পৌত্তলিকতা নির্ভর এক বিজাতীয় সংস্কৃতিতে সর্বতোভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে। আজ যখন আমাদের স্বাধীনতা প্রায় লোপাটই হয়ে গেছে তখনও তাদের মধ্যে বোধোদয় হয়েছে এমন কোন প্রমান দেশবাসী দেখতে পাচ্ছেনা। সুতরাং স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তাদের ভূমিকার দিকে দেশপ্রেমিক জনগনের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

সেনাবাহিনীকে আমি সমাজের একটি ভিন্ন শ্রেণির গুরুত্বপূর্ন অংশ বলেই মনে করি। আমি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নই। তবে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে আমার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা থাকাটাই স্বাভাবিক। মোটা দাগে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের তিন প্রকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ভৌগলিক সীমানা পাহারা দেয়ার জন্য প্রথম স্তরে সীমান্ত প্রহরী অর্থাৎ সাবেক বিডিআর এবং বর্তমানে বিজিবির সদস্যদের সাহসী, পেশাদার এবং অবশ্যই দেশপ্রেমিক হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষায় বিডিআর প্রশংসনীয় সাহসীকতার সাথে আমাদের উভয় প্রতিবেশীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ২০০১ সালে রৌমারির বীরত্ব বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। কিন্তু নতুন ভাবে সৃজিত বিজিবি এখন পর্যন্ত প্রধানত: ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগী রূপেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৩ সালের ৫ মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরের গনহত্যায় বিজিবি অংশ নিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর ভুয়া নির্বাচনেও বিজিবির সদস্যরা দখলদার সরকারকে সর্বাত্বক সহযোগীতা দিয়েছে। বিগত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ডাকাতি ও দিনের লুটপাটে বিজিবি ও মানুষের ভরসার জায়গা সেনাবাহিনী সেভাবে সহযোগিতা না করলেও আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতিতে নিরব ভূমিকা পালন করে সেনাবাহিনীর অতীত ঐতিহ্য ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে। অবৈধভাবে আওয়ামী স্বৈরাচারকে আবারও ক্ষমতায় আসে।সংগত কারনেই বর্তমান সরকারের আমলে পুনর্গঠিত বাহিনীটি নিয়ে জনমনে সংশয় এবং ভীতি রয়েছে।

রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সকল দেশেই পুলিশ বাহিনীর আবশ্যকতা রয়েছে। জনগনের করের টাকায় প্রতিপালিত সেই বাহিনীর চরিত্র কতখানি জনকল্যানমুখী হবে সেটি শাসকদের উপরই নির্ভর করে। ফ্যাসিবাদ কবলিত বাংলাদেশে তাই পুলিশ আাজ দলীয় পেটোয়া বাহিনী এবং শাসকশ্রেণির ব্যক্তিগত ‘ডেথ স্কোয়াডে’ পরিনত হয়েছে। গত শতাব্দীর ষাট এবং সত্তর দশকের দক্ষিণ আমেরিকার আদলে বাংলাদেশে আজ যে বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং গুম খুনের মহোৎসব চলছে তার সম্পূর্ন দায় বর্তমান শাসক এবং পুলিশ কম্যান্ড, উভয়কেই একদিন নিতে হবে।

একটি রাষ্ট্রে সীমান্তরক্ষী এবং পুলিশ থাকলেও, দেশের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তার (Core Security) ভার অবশ্যই সেনাবাহিনীর উপর ন্যস্ত। আমার পাঁচ কিস্তির বর্তমান লেখাটিতে একাধিকবার উল্লেখ করেছি যে, আমাদের স্থলসীমান্তের প্রায় পুরোটাই জুড়েই রয়েছে বিশালকায় ভারত। বাংলাদেশের সাথে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রটির সীমান্তের দৈর্ঘ্য চার হাজার কিলোমিটার। আমাদের সেনাবাহিনীর সামরিক কৌশল সম্পর্কে আমার কোন ধারনা নেই। তবে বিগত দশ বছর ধরে যেভাবে ভারতের সাথে অধীনতামূলক বন্ধুত্বের বয়ান চারদিকে চলছে তাতে আমাদের সেনাবাহিনীও যদি পারমানবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর প্রতি নমনীয় হয়ে পড়ে তাহলে তাদের হয়ত তেমন একটা অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের তৎকালিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন প্রায় নতজানু হয়েই তো প্রনব মুখার্জীর কাছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং জীবিকার জন্য করুণা ভিক্ষা করেছিলেন। বিশ্বের সকল সেনাবাহিনীর সামরিক কৌশল নিশ্চয়ই প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনা করেই নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের স্থল এবং সমুদ্রসীমার প্রতি হুমকি কোন দেশ থেকে আসতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সাধারন জ্ঞাণসম্পন্ন কেউ কি বলবেন হুমকি আসবে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা পাকিস্তান অথবা চীন কিংবা রাশিয়া থেকে? সকলেই নিশ্চয়ই বলবেন, দুই নিকটতম প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমারই আমাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকি। সেই ভারত এবং মিয়ানমার এদেশের শাসকশ্রেণির এমন ঘনিষ্টতম মিত্রে যদি পরিনত হয় যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যাবতীয় কার্যক্রম দিল্লি এবং ইয়াঙ্গুনের সাথে পরামর্শক্রমে পরিচালিত হবে তাহলে এদেশে সেনাবাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা নিয়েই তো প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া উচিৎ। আশা করি, ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি প্রনয়নকালে এই বিষয়গুলো রাষ্ট্রের সব নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এবং সেনাসদরের কর্তাব্যক্তিরা বিবেচনা করবেন। একটি দেশের সেনাবাহিনীকে কেবল যান্ত্রিকভাবে দেশপ্রেমিক নামে অভিহিত করাই যথেষ্ট নয়, জনগনের কাছে তাদেরকে প্রতি পদক্ষেপে দেশপ্রেমের প্রমানও দিতে হবে। বাংলাদেশের জনগন প্রত্যাশা করে যে, ভারত সামরিক দিক দিয়ে এই দেশের তুলনায় যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তাদের সাধ্য অনুযায়ী সীমান্তের ওপার থেকে আসা যাবতীয় আগ্রাসনের প্রাণপন মোকাবেলা করবেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমের পরীক্ষায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এবং জনগন সম্মিলিতভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সেই জন্যই ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত সিপাহী বিপ্লব এবং ১৯৭৫ সালের ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে প্রতিনিয়ত শানিত করে।

বাংলাদেশের জনগনকে এখন বুঝতে হবে যে, আমাদের লড়াই আর বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করা যাবে না। লড়াইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগনের সঙ্গে ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শাসক শ্রেণির মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী প্রকৃতপক্ষে দিল্লির দখলদারিত্বের প্রতিনিধিত্ব করছে। বাংলাদেশকে দিল্লির আশ্রিত রাজ্যে (Vassal State) পরিনত করবার জন্যই বিগত দশ বছরে রাষ্ট্রের প্রতিটি সার্বভৌম এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে এত নগ্ন ভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সকল আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সেগুলোকে জনগনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় একেবারে তৃনমূল পর্যায় থেকে জনগনকে সংগঠিত করে ক্ষমতার দূর্গে চুড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি নিতে হবে। পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহনের মাধ্যমে দিল্লির ফ্যাসিস্ট প্রতিনিধিকে কোন প্রকার বৈধতা প্রদানের অশুভ প্রচেষ্টা সেই জনযুদ্ধকেই বিলম্বিত করবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের ভীরু এবং বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক কর্মসূচি দখলদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবৈধ শাসনকাল দীর্ঘায়িত করতে সহায়ক হচ্ছে। চরম নির্যাতনকারী ক্ষমতাসীন সরকারকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে হলে সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগের প্রতি প্রকাশ্যে এবং জোরালোভাবে অনাস্থা জানানোর রাজনৈতিক কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে। উদাহরন স্বরূপ, বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারে যে, অবৈধ সরকারের বিচার বিভাগের সঙ্গে এখন থেকে কোন প্রকার সহযোগীতা প্রদান করা হবে না। আঠার লাখেরও অধিক রাজনৈতিক হয়রানিমূলক এবং মিথ্যা মামলায় আমরা সবাই যদি একযোগে আদালত বর্জন কর্মসূচি আরম্ভ করি তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে এই সরকারের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা সম্ভব হবে। অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় আদালত থেকে সকল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা হলে আমরা সবাই গ্রেপ্তার হওয়ার জন্য দেশের সকল থানায় স্বেচ্ছায় গিয়ে হাজির হতে পারি। এই শান্তিপূর্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যেমন, বশংবদ আদালতের মুখোশ উন্মোচিত করা যায়, একই ভাবে প্রশাসনকেও লাখ লাখ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করার চ্যালেঞ্জে ফেলে দেওয়া সম্ভব। তবে সেই চ্যালেঞ্জ করতে হলে বিএনপি নেতৃত্বকে জেলভীতির বিবর থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে। একই ভাবে বর্তমান দলীয় নির্বাচন কমিশন পরিচালিত যে কোন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়া হলে গনআন্দোলনের প্রেক্ষাপট রচিত হতে পারে।

মোট কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জনগনের গনতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার করবার প্রথম শর্তই হলো দিল্লির প্রতিনিধিত্বকারী শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের পতন। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেহেতু কোনরূপ সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করা সম্ভব নয়, কাজেই ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের মত জনগন এবং সৈনিকের ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গন-অভ্যুত্থানই প্রকৃষ্ট পন্থা। সেই ঐক্য প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সর্বত্র তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে ক্রমশ রাজধানীকে আচ্ছন্ন করে ফেলা সম্ভব বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আধিপত্যবাদ এবং সাম্রজ্যবাদের যৌথ প্রকল্প শাহবাগের গনজাগরন মঞ্চের ফ্যাসিবাদী আন্দোলনকে বাংলাদেশের দরিদ্র আলেম সমাজ ২০১৩ সালে অনেক রক্তের বিনিময়ে পরাভূত করেছিলেন। প্রধানত: গ্রাম এবং মফস্বল থেকে রাজধানীতে আগত আলেমরা সেদিন প্রমান করেছিলেন যে, সাধারন ধর্মভীরু দেশপ্রেমিক জনগনের ঐক্যের কাছে ন্যায়ের যুদ্ধে পরজীবি এলিট এবং বিত্তবানদের সমর্থনপুষ্ট দেশবিরোধী গোষ্ঠী সর্বদাই পরাজিত হয়। ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলন ছিল প্রধানত: ধর্মরক্ষার আন্দোলন। ২০২০ সালে যে আন্দোলনের জন্য দেশবাসী অপেক্ষা করে আছে সেটি দেশরক্ষা এবং ধর্মরক্ষা উভয় মহান লক্ষ্যেই সংঘঠিত হতে হবে। ১৬ কোটি মানুষের স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ আধিপত্যবাদ স্বল্প সময়ের জন্য পদানত করে রাখতে পারে। কিন্তু, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সেই বিপুল জনগোষ্ঠী জাগ্রত হলে সকল আগ্রাসী শক্তি পলায়নেই বাধ্য হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অশুভ মূহুর্তে দক্ষিন এশিয়ায় একমাত্র এই দেশটিকেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ কব্জা করতে পেরেছে। পয়ষট্টি বছরের প্রবীনত্বে আশা করতে চাই যে, এক মহান গনবিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমাদের বড় লজ্জার অমানিশার অবসান ঘটবে। চিরবিদ্রোহী নজরুল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পরাধীন ভারতের তরুনদের উদ্দেশ্যে আহবান জানিয়ে বলেছিলেন,
“কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান- হাঁকিছে ভবিষ্যৎ
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার”

আমিও নজরুলের মত আজ বাংলাদেশের জোয়ানদের দিকেই বড় আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি। স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে আমি সেই তরুনদের পাশে থাকতে চাই। করোনা পরবর্তী দায়িত্ব একটাই স্বৈরাচার অবৈধ ভারতীয় গোলাম আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা। আমার সকল দেশপ্রেমিক ভাই-বোনকে যুদ্ধে নামার আহ্বান জানাই। এ-ই যুদ্ধ দেশ রক্ষার, এই যুদ্ধ গণতন্ত্র রক্ষার, এই যুদ্ধ মানুষ রক্ষার, এই ইসলাম রক্ষার। না হয়ে বাঁচো, না হয়ে মরো! এ-ই মনোভাব নিয়ে যুদ্ধে নামুন। #ইনশাআল্লাহ স্বৈরাচার জননী শেখ হাসিনার পতন হবেই। কারণ দেশটা আমাদের ভারতীয় শকুন মুক্ত আমাদেরই করতে হবে। আছে কী সাহস ভারতীয় তাবেদার স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার? সাহস থাকলে বলুন তাহলে আপনাকেও সংযুক্ত করবো আমাদের সহযোদ্ধাদের দলে....!!

#তথ্য_সংগ্রহ_ও_সংযোজন, দৈনিক আমার দেশ, উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভারতীয় আধিপত্য, আওয়ামী রাজনীতি ও বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থ।

Comment As:

Comment (0)