No icon

চট্টগ্রামের প্রথম বিপ্লবী হাবিলদার রজব আলি খান

আরিফুল হক

ভারতের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা পি সি জোশী লিখেছিলেন, “সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে হিন্দু ইতিহাসবিদগণ মুসলমানদের অবদানকে উপেক্ষা করেছেন, নয় তো ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। তারা প্রায়শই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের নিষ্ক্রিয় অথবা বিরোধী ভূমিকা পালনের মিথ্যা কাহিনী প্রচার করেছেন। ইতিহাসকে বিকৃত করা একধরণের নোংরামি”।

এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের যে, ব্রিটিশদের পদলেহী, চামচা, ভাড়াটিয়া গুপ্তচররাও ভারতের ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত হিসাবে স্থান পেয়েছেন, অথচ যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই সংগ্রামে প্রকৃত অবদান রেখেছিলেন তারাই থেকে গেছেন নামহীন অখ্যাত।

আমাদের প্রজন্মের প্রায় সকলেই সেই বিকৃত, নোংরা, মিথ্যা ইতিহাস পড়ে বা জেনে বড় হয়েছে। তাদের কর্ণকুহরে মিথ্যা ইতিহাসের জয়ঢাক এমনভাবে বাজানো হয়েছে যে, সেই সুতীব্র কর্ণবিদারী আওয়াজে চাপা পড়ে গেছে এমন অনেক নাম, যারা আমাদের বন্দিত্ব, দাসত্ব ও পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করে আমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন। স্বাধীন জাতির গৌরব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

১৭৫৭ সালে, ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রের ফলে পলাশী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে উপমহাদেশে মুসলমান শাসনের পতন তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। তার ঠিক ১০০ বছর পর, ১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় স্বাধীনতার জন্য মহা সংগ্রাম, যার নাম সিপাহী বিপ্লব।

তারপর আরও ৯০ বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, উপমহাদেশ থেকে বিদেশী শক্তিকে সমূলে উৎখাত করে পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য। এই যে দীর্ঘ ১৯০ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, এইসব সংগ্রামে উপমহাদেশের মুসলমানরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়ের পর এমন একটি দিনও বাদ যায়নি, যখন মুসলমানরা স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করেনি। যেমন–

১৭৫৮ তে শাহ আলমের বিহার আক্রমণ। ১৭৬০ এ খাদিম হোসেনের পূর্নিয়া বিদ্রোহ। ১৭৬১ ও ‘৬৪ তে উধুয়ানালার যুদ্ধ ও বক্সার যুদ্ধ। ১৭৬৯ এ ফকির বিদ্রোহ। ১৭৭৮-৭৯ হায়দার আলির অভ্যুত্থান। ১৭৮৭ তে সিলেট বিদ্রোহ। ১৭৯২ এ টিপু সুলতানের যুদ্ধ। ১৭৯৫ এ আসাম বিদ্রোহ। ১৭৯৯ এ জামান শাহ্‌, আসাফদ্দৌলা, সিন্ধিয়া এবং রোহিলা সর্দার গোলাম মুহাম্মদ কে সংগঠিত করে টিপু সুলতানের মহাবিপ্লব ও শাহাদাত বরন। ১৮০৪ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহর বিপ্লব। ১৮১৬ তে বেরেলীর মুফতী আয়াজের নেতৃত্বে বিপ্লব। ১৮২০ থেকে ১৮৩১ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর বিপ্লব এবং বালাকোটে শাহাদাত বরণ। এরপর আরও অনেক যুদ্ধ লড়াইয়ের পর ১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় মহান সিপাহী বিপ্লব। এই সমস্ত বিপ্লব সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তিই ছিল মুসলমানরা। আজকের প্রজন্ম তাঁদের কজনেরই বা নাম জানে, কজনেরই বা খবর রাখে!

যাদের ইতিহাস নেই তারা ইতিহাস নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, অথচ মুসলমানদের হাজার হাজার বছরের আত্মিক সম্পদ, ঐতিহ্য সম্পদ থাকা সত্বেও আমাদের তরুণরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা পরিচয়হীনতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ আমাদের অজ্ঞানতা, শিক্ষা দীক্ষায় ঘাটতি, ইতিহাস চর্চায় অনীহার কারণে সম্ভব হয়েছে।

আমাদের প্রজন্ম ক্ষুদিরামের নাম জানে, তাঁর ফাঁসির গান গায়– “বড়লাটকে মারতে গিয়ে মারলাম ভারতবাসী”, কিন্তু জানেনা যে, ও গান মিথ্যা। ক্ষুদিরাম কখনও বড়লাটকে মারতে যাননি। তিনি এক বিচারপতি কিংসফোর্ডকে  মারতে গিয়েছিলেন! কিন্তু অসাবধানতাবশত এক নিরীহ ইউরোপিয়ান স্ত্রীলোক ও তার কন্যাকে হত্যা করে ফাঁসিতে যান।

ইংরেজ শাসনের দু’শ বছরের ইতিহাসে একজনই মাত্র বড়লাট বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন, তার নাম  লর্ড মেয়ো! আন্দামান জেল পরিদর্শন করতে গেলে তাকে দুঃসাহসিক ভাবে ছুরি দিয়ে হত্যা করে ফাঁসিতে যান, তরিকায়ে মুহাম্মদীয়া আন্দোলনের দুঃসাহসিক বীর শের আলি খান। গান বাঁধা তো দূরের কথা, এই বীরযোদ্ধার নাম শুনেছে কয়জন সেটাই গবেষণার বিষয়।

অত দূরে যাওয়ারই বা দরকার কি?

বাড়ীর কাছের- চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামী কাজী বজলুর রহমান, যিনি ১৯২৮ সালের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের অত্যাচারী জেলা শাসক, জি এইচ ডব্লু ডেভিসকে তার বাড়ীতে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ফাঁসিতে গিয়েছিলেন। এই অসীম সাহসী বীর কাজী বজলুর রহমানের  নাম ই বা বাংলাদেশের কয়জন মানুষ শুনেছে!

সবাইতো ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, মাতঙ্গিনীর নাম শুনেছেন, কয়জন শুনেছেন বিপ্লবী আশফাক উল্লাহ, হাফেজ গোলাম মাসুম, মওলানা ওবায়েদ উল্লাহ সিন্ধি, সৈয়দ নিসার আলি, আসগরী বেগম, আজিজুন বাই, জমিলা খাতুন, নুরুন্নিসা প্রমুখ হাজার হাজার বীর মুসলিম শহীদানের নাম।

মুসলিম জাতিকে সমতল জেলে বন্ধ রাখাও নিরাপদ নয় মনে করে, ব্রিটিশরা আন্দামান দ্বীপে কুখ্যাত সেলুলার জেল নির্মাণ করেছিল। সেখানে শাস্তির জন্য ছিল ফাঁসি কাঠ, ঘানি ঘর, কাঠের ফ্রেমে বেঁধে চাবুক মারার ফ্রেম। সেই জেলে নির্যাতিত হয়ে, ফাঁসিতে ঝুলে প্রাণ দিয়েছিলেন যে হাজার হাজার মুসলিম শহীদান, বর্তমান ভারত সরকার সেলুলার জেল থেকে সেইসব শহীদানদের নামগুলো পর্যন্ত মুছে ফেলার ব্যবস্থা করেছে।

বাংলার মুসলমানদের স্বার্থ বিরোধী, বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনের নায়ক সূর্যসেন অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেছিলেন, যদিও সে অস্ত্র তাদের কাজে লাগেনি। কারণ তাড়াহুড়ার কারণে তারা আর্মস নিয়েছিলেন কিন্তু এমুনিসান নিতে অর্থাৎ বন্দুক নিয়েছিলেন, বুলেট নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। যাইহোক, সূর্য সেনের সেই বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ছেলে বুড়োর মাথায় গেঁথে দেয়া হয়েছে।

সূর্য সেনের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন যদি কৃতিত্বের কারণ হয়, তাহলে সূর্য সেনের ৭৩ বছর আগে ১৮৫৭ সালের ১৮ই নভেম্বর চট্টগ্রামের বিপ্লবী হাবিলদার রজব আলি খান এর চট্টগ্রাম ট্রেজারি দখল, জেলখানা দখল করে বন্দীদের মুক্তি, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন শেষে জ্বালিয়ে দেবার মত কৃতিত্বের ইতিহাস চাপা পড়ে গেল কি করে?

কে ছিলেন হাবিলদার রজব আলি খান?

হাবিলদার রজব আলি ছিলেন ব্রিটিশদের ৩৪ নেটিভ ফোর্সের সৈনিক। সিপাহী বিপ্লবের সময় তিনি সিপাহী জামাল খান কে সঙ্গে নিয়ে ২, ৩, ৪ নং কোম্পানির বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।

হাবিলদার রজব আলির দুঃসাহসিক অভিযান

দেশে তখন সিপাহী বিপ্লবের আগুন জ্বলছে! ১৮৫৭ সালের ১৮ই নভেম্বর চট্টগ্রামের সিপাহীরা হাবিলদার রজব আলির নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। ঐদিন রাত আনুমানিক ৯টা/১০টার মধ্যে বিদ্রোহী সিপাহীরা ইতস্তত গুলিবর্ষণ করতে করতে কারাগারে প্রবেশ করে এবং কারাগার ভেঙ্গে কয়েদীদের মুক্ত করে দেয়। তারা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুট করে, কোষাগার লুট করে এবং সৈন্যদের ব্যারাকে আগুন লাগিয়ে দেয়। সিপাহীদের এই তৎপরতার সময় অমৃত সিং নামের একজন বরকন্দাজ নিহত হয়। ঐসময় বেশ কিছু ইংরেজ সেনা অফিসার নিহত হয়। ব্রিটিশ সৈন্যরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সমুদ্র জাহাজে গিয়ে আশ্রয় নেয়। রজব আলির সেনারা ৩০ ঘণ্টার মত চট্টগ্রাম কে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করে রাখে।

রজব আলির সেনাদল ১৯ নভেম্বর শেষরাতে চট্টগ্রাম ছেড়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা পীলখানা থেকে তিনটি সরকারি হাতি নিয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় গিয়ে ৭৩ নং দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সাথে যোগদান করা। কিন্তু ঢাকার সৈনিকদের অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং সেখানে বহু সিপাহীকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, এই খবর পেয়ে রজব আলির সিপাহীরা ফেনী নদী পার হয়ে ত্রিপুরার দিকে যাত্রা করে। ত্রিপুরার বিশ্বাসঘাতক রাজা ঢাকা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সিপাহীদের গতি রোধ করলে তাঁরা মনিপুর অভিমুখে যাত্রা করেন। পথে সিলেট অঞ্চলের লাতুস্থানে সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির মেজর বাঙ, সিপাহীদের উপর হামলা করে। তুমুল যুদ্ধে মেজর বাঙ নিহত হন এবং ইংরেজ সৈন্য পরাজিত হয়। সিপাহীরা মনিপুর রাজ্যে প্রবেশ করলে সেখানেও সিলেট বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই যুদ্ধে সিপাহীদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। তারপরও কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে, পরিশ্রান্ত, খাদ্যাভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া সিপাহীরা লড়াই করে পরাজিত এবং নিহত হন।

রজব আলির নেতৃত্বে সিপাহীরা শেষ যুদ্ধ করেন করিমগঞ্জের মালগ্রামে। তারা পার্বত্য অঞ্চল কাছাড়, হাইলাকান্দি ইত্যাদি পার হয়ে মোহনপুর টি-স্টেটের পাশে সাবাসপুর এলাকায় আশ্রয় নেয়। বেইমান জমিদার এ খবর ইংরেজদের জানিয়ে দিলে, লেফটেন্যান্ট রসের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী তাদে উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ৭০ জন সিপাহী শহীদ হন। পরে আরও অনেকে আহত হয়ে এবং রসদের অভাবে, শহীদের মৃত্যুবরণ করেন।

বীর হাবিলদার রজব আলির অন্তিম দিনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায়না। তবে কারো কারো মতে হাবিলদার রজব আলি সহ তিন চার জন সিপাহী শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইংরেজ বাহিনীর ফাইনাল রিপোর্ট অনুযায়ী, ইংরেজ সেনাদের ক্রমাগত অনুসরণের ফলে তারা রেঙ্গুনের পার্বত্য অঞ্চলের গভীরে হারিয়ে যান। তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

শুধু ইতিহাস থেকেই নয়, এই অকুতোভয় বীর শহীদরা আজ আমাদের স্মৃতি থেকেও হারিয়ে গেছেন। অথচ একটা নির্জীব, প্রাণহীন জাতীর জন্য এরাই হতে পারত অনুপ্রেরণার উৎস, বেঁচে ওঠার প্রাণরস। এই নির্ভীক নির্মোহ দেশপ্রেমিকদের জীবনীই হতে পারতো আমাদের দেশপ্রেমের পাথেয়, দেশের জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়ার অনুপ্রেরণা। এদের নিয়ে গবেষণামূলক ইতিহাস রচিত হলে, আমাদের আগামী প্রজন্মরা, নোংরা, মিথ্যা ইতিহাস পাঠের কুফল থেকে মুক্তি পেত। কিন্তু কোথায় সেই গবেষণা? কোথায় সেই ইতিহাসবিদ?

Comment As:

Comment (0)