No icon

হিন্দু নেতৃত্বের ওয়াদা আর বিশ্বাসঘাতকতা অভিন্ন

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন

মোদি যে মিথ্যা কথা বলেন, তা ভারতীয় রাজীতিক, নিরপেক্ষ ওয়াকবিহাল মহল এবং সংবাদ মাধ্যম বার বার শুনিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের সাথে এক সাক্ষাতকারে দাবি করেছেন, তিনি নাকি ক্ষমতা আসার প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক মজবুত করার চেষ্টা করছেন। মোদির সেই চেষ্টা বাংলাদেশের জন্য কতোখানি ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক তা বাংলাদেশের জনগণ আমার চেয়ে আরো বেশি বুঝেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এমন দাবি সত্যি নাকি মিথ্যে তার স্বাক্ষীও আমাদের জনগণ। শুধু মোদি নয় জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে মোদি পর্যন্ত সবাই এই অপগুণে দুষিত। তারা কেবল প্রতিবেশী নয়, স্বদেশবাসীর সাথেও এমনই ধাপ্পবাজি করেছেন, এখনো করছেন এবং ভবিষতেও করবেন। দেশটির নেতৃত্বের এমন ওয়াদা, মিথ্যাচারিতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্মমতার ওপর নির্ভর করেই ভারত নামক কাঁচের ঘরটি এখনো টিকে আছে।

তাদের আক্রমনে প্রথম এবং প্রধান শিকার মুসলিম জনগোষ্ঠী। মুসলিম শাসিত, প্রধান স্বাধীন হায়দারাবাদ দখল করতে সেনাহিনী পাঠিয়েছিলেন নেহরু এই মিথ্যা অজুহাতে যে, ’নিজাম’ (শাসকের উপাধি) স্যার মির ওসমান আলী খান আসাফ জ্যাই (৭তম) মুসলিম ধর্মাবলম্বী। একই নেহরু মুসলিম সংখ্যাগরীষ্ঠ দেশীয় রাজ্য কাশ্মীর দখল করে  মিথ্যা অজুহাতে। তারা তখন প্রচার করেছিলেন যে হিন্দু রাজা হরি সিং নাকি কাশ্মীরকে ভারতভুক্ত করার লিখিত ঘোষণা দিয়েছেন। এমন কোন সঠিক দলিল নেহরু কিংবা তার পরবর্তী ভারত সরকারগুলো কখনোই দেখাতে পারে নি।

উপমহাদেশে ব্রিটিশদের অধীনস্থ দেশীয় রাজ্যগুলোর পাকিস্তান ও ভারত-এর মধ্যে যেকোনটিতে যোগ দেয়ার যেসব শর্ত ব্রিটিশ সরকার বেঁধে দিয়েছিল, সেগুলো অনুযায়ী কাশ্মীরকে ভারতভুক্ত করার কোন অধিকার ও বৈধতা হরিসিং-এর ছিল না। এসব শর্ত হলো: (ক) রাজ্যগুলোর অধিকাংশের ধর্মীয় বিশ্বাস (যেহেতু উপমহাদেশ ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছে), (খ) তাদের মতামত এবং আশা-আকাঙ্খা এবং (গ) ভৌগোলিক নৈকট্যকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এই তিনটি শর্ত সামনে আনলে সম্পূর্ণ জন্মু-কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ হবার কথা। স্থানীয় জনগণও তা-ই চেয়েছিলেন।

কিন্তু রাজা হরিসিং এবং ভারতীয় নেতৃত্ব ব্রিটিশ সরকারের শর্তগুলো সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করেছিল। এই কারণেই আজ পর্যন্ত কাশ্মীরের জনগণ স্বাধীকারের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই জারি রেখেছেন। স্বাধীকারের দাবীতে কাশ্মীরের মানুষের জীবন-মরণ লড়াই দেখে ধূর্ত নেহরু কাশ্মীর সমস্যাকে জাতিসংঘে উত্থাপন করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয় যে, কাশ্মীরের জনগণ কী ভারতের সাথে থাকতে চান, নাকি পাকিস্তানে যোগ দিতে চান তা নিশ্চিত করার জন্য সেখানে জাতিসংঘের অধীনে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নেহরু এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করেন এবং জাতিসংঘসহ দুনিয়াবাসীর কাছে বার বার ঘোষণা দেন যে ভারত গণভোট অনুষ্ঠানে ওয়াদাবদ্ধ এবং এই গণভোটের ফলাফল ভারতের বিপক্ষে হলেও তারা মেনে নিবেন। এই প্রস্তাব গৃহীত হবার পর নেহেরু ১৬ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী (১৯৬৪) ছিলেন। কিন্তু কাশ্মীরে গণভোটের ওয়াদা পূরণ করার কোন উদ্যোগই নেন নি। ভারতের বিশ্বাসঘাতক নেতৃত্ব দাবি করে তাদের দখলীকৃত কাশ্মীরের জনগণ ভারতের উদ্যোগে বন্দুকের মুখে আয়োজিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছেন তারা ভারতের দখলদারিত্ব মেনে নিয়েছেন। সুতরাং গণভোটের কোন প্রয়োজন নেই। বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাচারিতা কাকে বলে?

নেহরুর দ্বিমুখী আচরণের আরেকটি নজির দেখুন: মানভাদর দেশীয় রাজ্য ছিল গুজরাটে, যেখানে কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মগ্রহণ করেন। মানভাদরের সুলতান তার রাজ্যকে পাকিস্তানে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু ভারত সেখানে হামলা চালায় এবং দখল করে নেয়। অজুহাত: মানভাদর মুসলিম-শাসিত হিন্দু-প্রধান রাজ্য হওয়ায় এটা ভারতের অংশ।

পাকিস্তানে যোগ দেয়া আরেকটি দেশীয় রাজ্যের নাম ‘জুনাগড়’। হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ ওই রাজ্যের শাসকও ছিলেন মুসলিম। তিনিও পাকিস্তানে যোগ দেন । কিন্তু ভারত হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠতার অজুহাতে জুনাগড়ও দখল কওে নেয়।

মুসলিম প্রধান কাশ্মীরের হিন্দুরাজা হরিসিং-এর ভারতে যোগদান বৈধ কিন্তু জুনাগড় বা মানভাদরের মুসলিম রাজাদের পাকিস্তানে যোগদান বৈধ নয় কিংবা মুসলিম নিজাম শাসিত স্বাধীন হায়দারাবাদ স্বাধীন থাকারও অধিকার নেই ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে।

আগ্রাসী নেহরু বিভিন্ন ধরনের মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বহু অঞ্চলকে ভারতভুক্ত করে। পূর্ব পাঞ্চাবের শিখদেরকে ‘স্বাধীনতার আলোচ্ছটা’ (গ্লো অব ইনডিপেনডেন্স) উপহারের স্বপ্ন দেখায় আর শিখ-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। এই দাঙ্গায় কয়েক লাখ মুসলিম ও শিখ নিহত হন, যা হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সম্ভাবনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কিন্তু শিখরা দেখতে পান পূর্ব পাঞ্চাব ভারতের উপনিবেশ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই ইন্দিরা গান্ধীর সময় শিখরা ভারত থেকে বের হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করলে ইন্দিরার নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী শিখদের পবিত্রতম তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান চালায় । ওই অভিযানে ৬০ হাজার শিখ নিহত হন। ওই হামলার আগে ও পরে সারা পাঞ্চাবে হাজার শিখ গুম এবং গুপ্তহত্যার শিকার হয়। পাঞ্চাবের ধান ক্ষেতে, গম ক্ষেতে খাল-নালা-নদীর পাড়ে রাস্তাঘাটে শিখদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যেত তখন। এটা ছিল শিখদের জন্য নেহরুর ‘স্বাধীনতার আলোচ্ছটা’র নজির।

কিন্তু সেই খালিস্তান আন্দোলন মরে যায়নি। আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ দুনিয়ার বহুদেশে খালিস্তানীরা সক্রিয়। কোন কোন দেশের সরকার পর্যন্ত পরোক্ষভাবে হলেও খালিস্তান আন্দোলনের প্রতি সহানভুতিশীল। ওইসব দেশে খালিস্তান পতাকা ওড়ে। ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে শিখরা খালিস্তানের পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ করে। খোদ পাঞ্চাবেও খালিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে দেয়াল লিখন দেখা যায়। ওই রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে স্বাধীন খালিস্তানের পতাকা ওড়ে।

উপমহাদেশ ভাগ হওয়া নিশ্চিত হবার মুখে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। নেহেরু পাঞ্জাবের প্রক্রিয়া স্বাধীন বাংলা গঠনের উদ্যোগকেও ব্যর্থ করেন। কলিকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে শহীদ-সোহরাওয়ার্দি-শরৎচন্দ্র বসু এবং তাদের সহাযোগীদের স্বাধীন বাংলা গঠন অসম্ভব করে। উল্লেখ্য, নেহরু প্রকাশ্যেই এবং লিখিতভাবে উপমহাদেশ বিভক্তির শর্ত জুড়ে দেয়। উপমহাদেশ ভাগ করতে হলে পাঞ্চাব ও বাংলাকেও ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে ভাগ করতে হবে যেন ওই দুটি ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশের যেসব অঞ্চল পাকিস্তানে যাবে সেগুলো আবার ভারতে ফিরে ভারতে ফিরে আসে।

নেহরুর আগ্রাসী চক্রান্তের শিকার আসাম মেঘালয়সহ আমাদের প্রতিবেশী সাতটি রাজ্য। ওইসব অঞ্চল কখনোই ১৮২৬ সালের আগে ভারতীয় ভূখন্ডের সাথে যুক্ত ছিল না। এমনকি চন্দ্রগুপ্ত কিংবা অশোকের সময় না। ব্রিটিশদের বিদায়ের সময়েও তারা ভারতভুক্ত হতে চায় নি। ধূর্ত নেহরু বিপুলসংখ্যক মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে গণভোটের বাইরে রাখে। ওই সময়ে অহমিয়া হিন্দু নেতৃত্বকে গণভোট না করার জন্য প্ররোচিত করা হয়। এমন কি ১৮২৬ সালের আগেকার মতো স্বাধীন থাকতে অর্থাৎ ভারতের বাইরে স্বাধীনতার দাবি না করতে পরামর্শ দেয়। তাদেরকে বুঝানো হয় যে, ব্যাপক মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের পাশে আসাম স্বাধীন দেশ হলে তা ঠিকবে না। আসাম পাকিস্তানের দখলে চলে যাবে।

ওই সময়ে মেঘালয়, ত্রিপুরা, মনিপুর, ন্যাগাল্যান্ড রাজাশাসিত দেশীয় রাজ্য হিসেবে আসামের বাইরে ছিল। এসব দেশীয় রাজ্যসমূহের রাজাগণ ভারতে যোগদানে সম্মত ছিলেন না। নানা ধরনের চক্রান্ত এবং জোরপূর্বক ভারতের অংশ হতে বাধ্য করা হয় তাদেরকে। ত্রিপুরার রানীকে গ্রেফতার এবং ভবিষ্যু রাজা তার শিশু ছেলেকে চিকিৎসার নামে দিল্লী নিয়ে স্বাভাবিক রোগে মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ঐতিহাসিক মতে তাকে চক্রান্তের মাধ্যমে হত্যা করে প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রে ত্রিপুরা রাজ্য ভারতের হাতে তুলে দিতে রানীকে বাধ্য করা হয়।
উল্লেখ্য, রানী প্রথমেই ত্রিপুরাকে পূর্বপাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ওই প্রস্তাবে সাড়া না দেয়া সত্বেও নেহেরু ত্রিপুরা দখল করে নিয়েছিলেন। দেশীয় রাজ্যগুলো কোন দেশের সাথে যুক্ত তার নিরেখে ত্রিপুরা পূর্ব পাকিস্তানের ভূখন্ড ঘেরাও থাকায় ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণেভারতে নয়, পাকিস্তানের সাথে মিশে যাবার কথা এবং রাণী তা-ই চেয়েছিলেন।

অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্র মণিপুর ব্রিটিশদের বিদায়ের পরেও স্বাধীন ছিল। নেহেরু সরকার মণিপুরের হিন্দুরাজাকে ভারতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানায়। রাজা ভারতের প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে তাকে আলোচনার জন্য আসামের তৎকালীন রাজধানী শিলং’এ যাবার দাওয়াত দেয়া হয়। রাজা সেখানে যাবার পর মণিপুরকে ভারতের সাথে মিশিয়ে ফেলার জন্য আবার চাপ দেয়া হয়। রাজা কোনভাবেই রাজী না হওয়ায় নেহেরু সরকার তাকে ওখানেই আটকে রাখে এবং বলা হয় ভারতে যোগ না দেয়া পর্যন্ত রাজাকে মুক্তি দেয়া হবে না। এভাবে মণিপুর ভারতের জোরের শিকার হয় এবং স্বাধীনতা হারায়। এমন পরিস্থিতিতে মেঘালয়ের রাজাকে লোভ এবং পাশাপাশি ভয় দেখালে তিনি স্বাধীন দেশ হারিয়ে ভারতের কাছে মাথানত করেন।

১৯৪৭ সালে তৎকালীন আসামে গণভোট হলে ওই রাজ্যের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানের অংশ হতো। ওই সময় আসামের ২৭টি জেলার মধ্যে নয়টি জেলাই ছিল মুসলিম সংখ্যাগরীষ্ঠ। আরো ক’টি জেলায় মুসলমানদের সংখ্যা ৪০শতাংশ কিংবা তারও বেশি ছিল। ওইসব জেলাগুলো তেল-কয়লাসহ বিভিন্ন ধরনের খনিজ এবং কৃষিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল।

আসাম ছাড়া প্রতিটি দেশীয় রাজ্যকে বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত কিংবা ভয় দেখিয়ে ভারতের অন্তর্ভূক্ত করা হয় তখন। বিট্রিশদের বিদায়ের সময় কেবলমাত্র নাগ্যাল্যান্ড ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ফিজোর নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ভারত সামরিক অভিযান চালিয়ে ফিজো সরকারকে হঠিয়ে নাগাল্যান্ড দখল কওে নিয়েছিল।

এই সাতটি রাজ্যকে দখলে রাখার জন্য নেহেরু এবং পরবর্তী সরকারগুলো ভারতের বিভিন্ন রাজ্য হতে বিপুল সংখ্যক ভারতীয়কে পুনর্বাসিত করে। ফলে প্রশাসনসহ অন্যান্য শাখা বহিরাগতদের দখলে চলে যায়। আসামসহ অধিকাংশ রাজ্যেই স্থানীয়রা ক্রমে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন। এখন ওইসব ভারতীয়দেরকে বাদ দিয়ে কেবল মুসলমানদেরকে আসাম হতে বের করার চক্রান্ত চলছে।

অথচ ব্রিটিশদের আসাম দখলের (১৮২৬), এমনকি হযরত শাহাজালালের সিলেট আগমনেরও আগে মুসলমানরা আসামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ভারতীয় পত্রিকা ‘আউটলুক’ (এপ্রিল ২২, ২০১৬) জানায় বাংলার মুসলিম শাসক ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর আসাম অভিযানের পর থেকেই আসামে মুসলমানদের বসবাস শুরু হয়।

১২০৬ সালের দিকে বখতিয়ার খিলজীর সময়ে জনৈক স্থানীয় উপজাতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আলী মেচ নাম ধারণ করেন, যার মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসীদের সমাজে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে।

হিন্দুস্তান টাইম্স ( জানুয়ারী ২৮, ২০২০) জানায়, মুসলিম শাসকগণ আসাম আক্রমণের সময় যেসব মুসলিম সৈন্য আসামের রাজার সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন তারাই আসামের আদি মুসলমান। এদেরকে রাজাদের বিভিন্ন রাজকীয় দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া হয়। এদের মাধ্যমে ইসলামের জীবনদর্শন ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় আদিবাসীরা, বিশেষত কোচ-রাজবংশীরা ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে ইসলাম স্থানীয়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
আবার ১৮০০ সালের মাঝামাঝি ব্রিটিশ সরকারই আসামের জঙ্গলময় অনাবাদি পাহাড়ী এলাকা এবং জলাভূমিকে কৃষিকাজের আওতায় আনার জন্য তৎকালীন পূর্ববাংলার বিপুলসংখ্যক মুসলিম কৃষকদের আসামে নিয়ে যায় এবং তারা সেখানেই থেকে যান । বর্তমানে আসামে বসবাসকারী মুসলিমরা ওই সময় সরকারী উদ্যোগে আসামে নেয়া বৈধ মুসলমানদেরই বংশধর।

অহমিয়া মুসলমানদের প্রসঙ্গে লেখা ইতিহাস কিংবা গবেষণায় আসামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশে মুসলমানদের ভূূমিকা স্বীকার করে প্রশংসা করা হয়েছে। অহমিয়া বাংলাভাষী মুসলমানরা নিজের ভাষা বাদ দিয়ে অহমিয়া ভাষায়কে এখন তাদের মাতৃভাষা হিসেবে ভালোবাসেন। আর মোদি সেই মুসলমানদেরকে আসাম থেকে বের করতে বদ্ধপরিকর।

ভারতীয় নেতৃত্বের এমনি বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার শিকার একেবারেই শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ স্বাধীন দেশ সিকিম। ব্রিটিশ আমলে সিকিমের যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় ব্রিটিশ সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়ে সিকিম আধা স্বাধীন আশ্রিত রাজ্য ছিল, দেশীয় রাজ্য নয়। তাই দেশীয় রাজ্যের তালিকায় সিকিমের নাম নেই। ব্রিটিশদের বিদায়ের পর সিকিম পরোপুরি আগের মতো স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকে থাকতে চেয়েছিল ।
কিন্তু ওই সময়ে ভারতের প্ররোচনায় সিকিম কংগ্রেসের ভারতীয় দালালরা সিকিমকে ভারতভুক্ত করার দাবি জানায়। তৎকালীন চৌগিয়াল বিব্রতবোধ করেন। ১৯৫০ সনে ধূর্ত নেহরু সিকিমের পররাষ্ট্র, বহির্বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দায়িত্ব ভারতের হাতে রেখে সিকিমের পৃথক অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা এবং রাজতন্ত্র অক্ষুণ্ন রাখার শর্তে সিকিমকে ভারতের আশ্রিত মেনে নিয়ে মৈত্রী ও সহযোগিতামূলক চুক্তি করেন। অথচ ১৯৭৩ সনে তারই মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী সিকিম দখল করার জন্য ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে নির্দেশ দেয়। তখন থেকেই ‘র’ সিকিমে বিপুল সংখ্যক চর সংগহের উদ্যোগ নেয়। সিকিমে নিয়োগ দেয়া ‘র’-এর সদস্যদের মূল দায়িত্বই ছিল সিকিমকে ভারতের দখলের নেয়ার পথ তৈরি করা। ধীরে ধীরে সিকিমে রাজাকে ক্ষমতাহীন করার লক্ষে সিকিমী চরদের মাধ্যম রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করা হয় তখন। চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের অধীনে তথাকথিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভারতীয় চর সিকিম কংগ্রেস নেতা লেন্দুপ দর্জির দলকে অভাবনীয়ভাবে সিকিম সংসদের মোট ৩২টি আসনের মধ্যে ৩১টিতে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী লেন্দুদর্জি এবং তার দলের অন্যসব অনুগতদের দিয়ে সংসদে সিকিমকে ভারতভুক্ত করার প্রস্তাব পাস করা হয়। পরবর্তীতে এই প্রস্তাবে চৌগিয়াল অনুমোদন করতে রাজী হন। এরই পরিণতিতে এককালে ভারতের অনুগত বন্ধু চৌগিয়ালকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারত ১৯৭৫ সালের ৯ এপ্রিল সরাসরি সিকিম দখল কওে নেয়।

অথচ এর আগে নেহেরু প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন: আমরা যদি সিকিমের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশকে শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের বলয়ে নিয়ে আসি, তা’হবে বুলেট দিয়ে একটি উড়ন্ত মাছিকে মারার মতো” (জওহরলাল নেহেরু, দ্য স্টেটমেন্ট, ৩ জুন, ১৯৬০)

শত ধরনের চক্রান্ত, ধোকাবাজি, মিথ্যাচারিতা ও প্রতারণার মাধ্যমে স্বাধীন দেশ সিকিম দখলের পর দেশপ্রেমিক চৌগিয়াল ইন্দিরা গান্ধীর কাছে যে চিটি লিখেছিলেন তা দুনিয়াজুড়ে শতাব্দীর পর শতাদ্বী ধরে যেকোন বিবেকবান মানবতাবাদীকে কাঁদাবে এবং ধূর্ত ও আগ্রাসী ইন্দিরা এবং কুৎসিত সহযোগীদেরকে ধিক্কৃত এবং অভিশপ্ত করবে। ওই চিঠিতে (এপ্রিল ৯, ১৯৭৫) বেদনাহত চৌগিয়াল লিখেছেন:
“কিছু বলার জন্য আমার কোন ভাষা নেই। যখন ভারতীয় সেনারা আজ (এপ্রিল ৯, ১৯৭৫) তিনশতেরও কম সিকিমের প্রহরীদের ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ আক্রমণ করে, যাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনীই প্রশিক্ষণ দিয়েছিল এবং অস্ত্রসজ্জিত করেছিল, যারা একে অপরকে সহযোগী বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করতেন। —— গণতান্ত্রিক (?) ভারতের ইতিহাসে এটা খুবই জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ন এবং কালো দিবস (হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে, যেদিন), আমাদের ছোট্ট দেশটির অস্তিত্বকে শক্তি প্রয়োগ করে বিলূপ্ত করা হয়েছে।”

এটা হলো নেহরুর ওয়াদায় বিশ্বাস করেই ভারতকে বন্ধু হিসেবে মেনে নেয়ার খেসারত। আগ্রাসী ভারতের একনেতা যে ওয়াদা করেন, চুক্তি করেন পরের শাসকরা সময়ের ব্যবধান তা লঙ্ঘন করেন। আবার কেউ কেউ নিজেই তার ওয়াদাকৃত চুক্তি হতে সরে যান। এই ধরনের অসংখ্য নজির ভারতীয় নেতৃত্ব স্থাপন করেছে। নেহেরু নিজেই কাশ্মীরে গণভোটের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে তা বাস্তবায়নের ওয়াদা করেও পালন করেন নি।

অন্যদিকে নেহরু কাশ্মীরকে ভারতীয় শাসনতন্ত্রে যে বিশেষ মর্যাদামূলক স্বায়ন্তশাসন নিশ্চিত করেন, মোদি ক্ষমতায় এসে ভারতীয় সংবিধানে উল্লেখিত ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদাও ছিনিয়ে নিয়ে কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করেন। ভারতীয় নেতৃত্ব আজ যা বলবে আগামী দিন তা হতে সরে যাবে। আজ বন্ধু বলবে আগামীকাল দুষমণের চেয়েও জঘন্য আচরণ করবে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘পদ্ম গোখরা’ অনুযায়ী বিষধর সাপকেও বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু ভারতকে বিশ্বাস করার কোন সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকার তথা আমাদের নীতি-নির্ধারকদেরকে সাবধান করাই এই নিবন্ধ লেখার উদ্দেশ্য। মনে রাখতে হবে নেহেরু এমনকি কংগ্রেস প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাঞ্চাব ভারতের সাথে মিশে যাবে। ভারতের সাথে একের পর এক ভারতের স্বার্থ মোতাবেক যে ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে এবং হবে, তা যে দেশের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বেরে জন্য বিপদজনক হবে না সেটা বিশ্বাস করা যায় না। ভারতের সাথে সামরিক, বাণিজ্যিক চুক্তিসহ যতো চুক্তি হয়েছে সবগুলো পর্যালোচনা করা উচিত। জনগণ এই ধরনের চুক্তি মানেন কী না, সেটা নিশ্চিত করার জন্য উন্মুক্ত বিতর্ক হওয়া দরকার। দরকার এই বিষয়ে গণভোট নেয়ার যেন শেখ হাসিনা ভারতকে বলতে পারেন জনগণই ঠিক করবেন এসব চুক্তি গ্রহণযোগ্য কী না। কমপক্ষে সামরিক চুক্তি, ট্র্যানজিটের নাম পুরো বাংলাদেশকে ভারতীয় ভূখন্ডের মতো ব্যবহার করার চুক্তিগুলো হতে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় আমাদের দেশ সময়ের ব্যবধানে বিশ্ব মানচিত্র হতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এজন্য ভারত আরো একশত বছর হায়েনার মতো অপেক্ষা করবে, কিন্তু তাদের আগ্রাসী নীতি পিছাবে না। ওই স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যেই ভারত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল।

Comment As:

Comment (0)