No icon

আওয়ামী ভোট ডাকাতির দ্বিতীয় বার্ষিকী ও বাংলাদেশের অর্জন

তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশ। নির্বাচনে ভোট চুরি বা কারচুপি নতুন কিছু নয়। দুর্নীতি যেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, সেখানে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মত শব্দগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কমই দেখা যায়। তবে নব্বইয়ের পর বাংলাদেশের নির্বাচনগুলি এর ব্যতিক্রম ছিল।  তখন নির্বাচন-কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রচেষ্টা চালান হয়।  এই প্রচেষ্টায়  নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্ততপক্ষে তিন তিনবার মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পায়।  নির্বাচন-কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা বাংলাদেশে প্রবর্তনের জন্য জামাত ইসলামী তো অবশ্যই এমনকি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিও ধন্যবাদ পেতে পারে। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীকে আন্দোলনে পরিণত না করলে জামাতের পক্ষে একা এই  দাবী আদায় সম্ভব ছিলনা। তাছাড়া, বিএনপিরও যদি স্বদিচ্ছা না থাকতো,  তাহলে বাংলাদেশ হয়ত সেসময়ই আরেকটি স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে চলে যেতে পারত।

মানুষের প্রত্যাশা ছিল, নব্বইউত্তর এই গণতান্ত্রিক চর্চা ধীরে ধীরে আরও উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে নির্বাচনের রাজনীতিতে পরাজিত আওয়ামী লীগ চরমপন্থি অপরাজনীতির আশ্রয় নিলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। চরমপন্থি ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন সাদা আধিপত্য-বাদী চেতনাকে অ্যামেরিকার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। ভারতের চরমপন্থি দল বিজেপি যেমন হিন্দুত্ব চেতনাকে ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যতম বড় গণতন্ত্রের মাথায় কুঠারাঘাত করছে।  তেমনি আওয়ামী লীগকেও চরমপন্থি দলগুলোর মত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরতে দেখা যায়।

দুহাজার আঠারো সালের তিরিশে ডিসেম্বরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সবকটি দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলে।  এই সর্বদলীয় ঐক্যে  ছাত্র, শ্রমিক,  পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষেরাও  যোগ দেয়। কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতে  আওয়ামী লীগের নজিরহীন ভোট ডাকাতি বিশ্বকে অবাক করে দেয়। যদিও আওয়ামী লীগের জালিয়াতির ইতিহাস নতুন কিছু নয়, তবুও মধ্যরাতের ভোট ডাকাতি একটি নতুন ইতিহাস তৈরি করে। এর আগে তাদের তিয়াত্তরের ভোট জালিয়াতি বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতো।  তবে এবার তারা নিজেরাই নিজেদের রেকর্ড ভঙ্গ করে।  তিরিশে ডিসেম্বরের নির্বাচন তিয়াত্তরের ভোট ডাকাতিকেও হার মানায়।  আজ সেই মধ্যরাতের ভোট ডাকাতির দ্বিতীয় বার্ষিকী।

আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে বাংলাদেশের মানুষ সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু আসলেই কি তাই? অনেকেই এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিরোধীদলগুলোর সমালোচনা করে থাকেন। দেখা যায় আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী অপকর্মের পরিবর্তে নিষ্পেষিত বিরোধীদলগুলোর সমালোচনা অনেকের বেশি পছন্দ। দুহাজার চৌদ্দ সালে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে এবং  দুহাজার নয় সালে অংশ নিয়ে, উভয়ক্ষেত্রেই বিরোধীদলগুলো তাদের সমালোচনার শিকার।  তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তিরিশে ডিসেম্বর নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল।

অন্যতম প্রধান অর্জন ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ছদ্মবেশে ফ্যাসিবাদ এবং উন্নয়নের আড়ালে এক ক্লেপ্টোক্র্যাটের মুখোশ উন্মোচন।  শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টা ছিল বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মানুষকে জঙ্গি এবং নিজেদের জঙ্গিবাদ বিরোধী হিসেবে দেখানো। কিন্তু দুহাজার আঠারো সালের নির্বাচনের পর বিশ্ববাসী তাদের আসল চেহারা আরও ভালভাবে চিনতে পারে। নির্বাচনের ফলাফলের দুদিন পর ওয়াশিংটন পোস্ট লিখে, “…… was a result one might expect in a place like North Korea,…… Hasina, Bangladesh’s increasingly authoritarian leader, consolidated her grip on power but at the cost of her own electoral legitimacy.” – এর অর্থ দাঁড়ায়, … এরকম নির্বাচনের ফলাফল শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়ার মতো দেশেই প্রত্যাশা করা যায়। …… বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী হাসিনা নিজের নির্বাচনী বৈধতার পরিবর্তে তার ক্ষমতাকেই আরও কুক্ষিগত করল।

এই নির্বাচনে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদেরকে বিভিন্ন কৌশলে বাইরে রেখে ভুঁইফোড় কিছু সংগঠন কে পর্যবেক্ষক হিসেবে দেখিয়ে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।  দেশীয় প্রধান তিনটি পর্যবেক্ষক সংস্থা ফেমা, অধিকার ও ব্রতীকে  নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয় না।  ওয়াশিংটন ভিত্তিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউটের হয়ে দ্য এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনের (এনফ্রেল) -এর আসার কথা থাকলেও ভিসা বিষয়ক জটিলতা সৃষ্টি করে তাদেরকেও বাদ দেওয়া হয়। এবিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ও নির্বাচনের পূর্বে নাগরিকদের উপর বিধিনিষেধ এবং বিরোধী দলের অসংখ্য সদস্যকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন।  ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টও নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে না বলে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দেয় এবং ইইউ মিশনও বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।  তারা জানায়, ইপি’র কোন সদস্য যদি বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করেন সেটা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতামত হিসেবে বিবেচিত হবে না।  ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে ডয়েচে ভেলের রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে  তাদের সন্দেহ রয়েছে বলেই তারা আসতে নারাজ।

বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন যায়গা থেকে ভুঁইফোড় সংগঠনকে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এনিয়ে সাতই জানুয়ারি ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, হেডিং  ছিল, “দু’টি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সমাচার”। এনফ্রেলের সদস্যদেরকে ভিসা না দিলেও বিদেশ থেকে তাদের পছন্দ মাফিক কিছু পর্যবেক্ষক নিয়ে আসার জোর চেষ্টা চালানো হয়। তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়।  সেসময় তাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে অনেকে বলেন হাই-কমিশন ও দূতাবাসগুলোকেও নাকি এই কাজে নিয়জিত করা হয়েছিল। এই নির্বাচনে দেখা যায় রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ভোট ডাকাতির কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এবিষয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গাম্যান প্রকাশিত একটি গোপন নথিতে দেখা যায় পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোট ডাকাতির কৌশল এবং তা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সবকিছু অত্যন্ত্য গোপনীয়তার সাথে করার চেষ্টা করেলেও যতটুকু প্রকাশ পায় তাতেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান তলানির নিচে নেমে যায়।

মুখোশ উন্মোচন ছাড়াও বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারা। সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসাটা মির্জা ফখরুল, ব্যারিস্টার মইনুল এবং অন্যান্য উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন কাজ ছিল। এই ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করতে দলদাস মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবী নামের আওয়ামী এনেইবলাররা সবসময় তৎপর ছিল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তারেক জিয়ার ইমেজ এবং জামাতের গ্রহণযোগ্যতা। আওয়ামী লীগ অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে বহুবছর ধরে তারেক জিয়াকে দুর্নীতিবাজ এবং জামাতকে যুদ্ধাপরাধী ট্যাগ লাগিয়ে দেশময় ঘৃণার চাষ করেছে।  কিন্তু তারেক জিয়াকে ছাড়া বিএনপি কল্পনায় করা যায় না আবার তার ইমেজের কারণে তাকে সাথে নিয়ে ড. কামালদের সাথে ঐক্যও ছিল কঠিন। ঐক্যের জন্য ড. কামালদের ফেস ভ্যাল্যু থাকলেও তারা মূলত ভোটার বিহীন নেতা। এদিকে জামায়াতের ফেস ভ্যাল্যু নিয়ে সঙ্কট তবে বেশ বড় ভোট ব্যাঙ্ক আছে। এই টানাপোড়নের মধ্যে ঐক্য যদিও অত্যন্ত দুরূহ ছিল তারপরেও বিএনপি সুকৌশলে তাদের বিশ দলীয় জোট অটুট রেখে, তারেক জিয়াকে সসম্মানে তার অবস্থানে রেখেই জাতীয় ঐক্য করতে পেরেছিল।

বিশেষ কোন দল বা আদর্শ নয় বরং এই ঐক্য-ফ্রন্টকে প্রকৃত অর্থেই একটি জাতীয় ঐক্যের রূপ দিতে পারায় ধীরে ধীরে এই ঐক্য সমস্ত জনসাধারণের সমর্থন পেয়েছিল। জনতার এই ঐক্যই মূলত আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি বেসামাল করে ফেলেছিল। তাদের রাতের আঁধারে ভোট ডাকাতি ছাড়া ক্ষমতাই টিকে থাকার আর কোন পথ খোলা ছিল না। আওয়ামী লীগের  সহিংস অপরাজনীতির জবাবে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ যারা গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে চায় তাদের সবার একসাথে হওয়ার মাধ্যমেই এই ফ্যাসিবাদ এবং ক্লেপ্টোক্র্যাটের পতন সম্ভব।

Comment As:

Comment (0)