No icon

পরিবারতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র নাকি গণতন্ত্র?

শেখ ফজলে শামস পরশকে যুবলীগের চেয়ারম্যান করার পরে রাজনীতিতে আত্মীয়করণের প্রশ্নটি আবার সামনে চলে এসেছে। গত রাত থেকেই বিশেষ বুদ্ধিজীবীদের অনেকে এটা নিয়ে নানা কথা বলা শুরু করেছেন। যদিও এর পেছনে কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ নেতার পূর্বপুরুষ কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে জন্ম ও বেড়ে উঠা ছেলে মেয়েরা অগ্রজদের পথ অনুসরণ করে অনেকেই রাজনীতির মাঠে আসতে কেন বাধ্য হন তা অনেকেই জানেন না। অন্যভাবে বললে কেন রাজনীতিতে পরিবারের সদস্যদের টেনে আনা হয় তার কারণ অনুসন্ধানের আগে দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোটাদাগে কে কার আত্মীয়!

মিডিয়ার খবরে জানা যায় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকেই আছেন যারা বড় বড় নেতার ‘ঘনিষ্ঠ আত্মীয়’। আবার কেউ কেউ লতায়-পাতায় আত্মীয়। ‘বঙ্গবন্ধুর’ বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ‘শেখ হাসিনার’ একমাত্র মেয়ে ‘সায়মা ওয়াজেদ’ (পুতুল)। তার স্বামী ‘খন্দকার মাশরুর হোসেন’ (মিতু) বর্তমান সরকারের সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী ‘ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। যার ফলে প্রধানমন্ত্রী ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ সম্পর্কে বেয়াই-বেয়াইন। আবার পুতুলের দাদা শ্বশুর খন্দকার নুরুল হোসেন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের আরেক আত্মীয় হলেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমান হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার খালা শাশুড়ি। সে হিসেবে জিল্লুর রহমান হলেন শেখ হাসিনার তালই। সেই হিসেবে পাপন তাঁদের আত্মীয়।

বঙ্গবন্ধুর বোন আছিয়া বেগমের তিন ছেলে হলেন শেখ ফজলুল হক মণি ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ মারুফ। সম্পর্কে তারা শেখ হাসিনার আপন ফুফাতো ভাই। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে শহীদ হন। তার ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ এবার যুব লীগের চেয়ারম্যান হলেন। ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম হলেন সাবেক মন্ত্রী ও গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য। শেখ সেলিমের বোনের ছেলে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। যিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নেতা ছিলেন। যুবলীগের বিদায়ী সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী শেখহাসিনার ফুফাতো বোনের স্বামী।

বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের। তার ছেলে হলেন এমপি শেখ হেলাল। তার ছেলেও বর্তমানে এমপি।

বঙ্গবন্ধুর বড় বোনের স্বামী হলেন আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আবদুর রব সেরনিয়াবাত। সেরনিয়াবাতের ছেলে হলেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। শেখ হাসিনা ও হাসানাত আবদুল্লাহ পরস্পরের মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোন। আবার হাসানাত আবদুল্লাহর ছোট বোনের দেবর হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ। আবার হাসানাত আবদুল্লাহর চাচাতো ভাই হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক কবির নানক।

শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই হলেন মাদারীপুরের সাবেক এমপি প্রয়াত ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী। ইলিয়াস চৌধুরীর বড় ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী) এমপি, ছোট ছেলে মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র এমপি।

শেখ হাসিনার সম্পর্কে আরেক ফুফাতো ভাই হলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাদারীপুর-৩ আসনের এমপি বাহাউদ্দিন নাছিম।

এছাড়া শেখ হাসিনার সম্পর্কে ফুফা হলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু। তার স্ত্রী প্রয়াত ফিরোজা হোসেন সম্পর্কে শেখ হাসিনার ফুফু।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব প্রয়াত শেখ শহীদুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার খালাতো ভাই। শেখ শহীদুল ইসলাম ছিলেন এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। শেখ হাসিনার দূরসম্পর্কের ফুফা হলেন লে. জেনারেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান বীরবিক্রম।

প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পারিবারিক সম্পর্ক পুরানো। দু’জনের নানাবাড়িই জলপাইগুড়ি এলাকায়। পুরানো সম্পর্কে তারা পরস্পরের দূরসম্পর্কীয় খালাতো ভাই-বোন। জিয়া পরিবারের দুই সন্তান তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।

তারেক রহমানের শ্বশুর হলেন বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর সাবেক প্রধান মাহবুব আলী খান। তারেক রহমানের জেঠা শ্বশুর হলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী।

তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের খালু হলেন ফরিদপুরের বিখ্যাত খন্দকার পরিবারের সন্তান হিরু মিয়া। আর হিরু মিয়া হলেন বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের চাচাতো দাদা শ্বশুর।

খালেদা জিয়ার বড় বোন প্রয়াত খুরশিদ জাহান হক ছিলেন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী। খালেদা জিয়ার দুই ভাগনে। ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন, সাইফুল ইসলাম ডিউক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। খালেদা জিয়ার ভাই প্রয়াত মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার। ওয়ান ইলেভেনের ফখরুদ্দিন সরকারের সময়ে আলোচিত সেনাকর্মকর্তা লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে সাঈদ এস্কান্দার ভায়রা ভাই। আবার সাঈদ এস্কান্দারের বেয়াই হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও হোটেল রাজমণি ঈশা খাঁর মালিক আহসান উল্লাহ মণি। বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার স্ত্রী সিগমা হুদার বড় ভাই দারা কবির বিয়ে করেছেন জিয়াউর রহমানের খালাতো বোন আতিকা শিরিনকে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ সময়ের প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার আপন ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের বর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। এরশাদের শ্যালক হলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদ। তার শ্বশুর হলেন বিএনপির প্রথমদিকের অন্যতম শীর্ষ নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া। যাদু মিয়ার মেয়ে মুক্তি রহমানকে বিয়ে করেছেন এরশাদের শ্যালক মহিউদ্দিন আহমেদ। সে হিসেবে এরশাদ এবং ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের সভাপতি জেবেল রহমান গানি পরস্পরের আত্মীয়। আবার রওশন এরশাদের বড় বোন মমতা ওয়াহাব ছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রী।

এমন খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে। সেদিকে না গিয়ে আমরা উত্তরাধিকার বা আত্মীয়করণের রাজনীতির বাহ্যিক বা রাজনৈতিক কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।

পাকিস্তানে ভূট্ট পরিবার পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটা ফ্যাক্টর। জুলফিকার আলী ভূট্টকে ফাঁসিতে হত্যা করার পরেও, তার আওলাদরা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হবার পরেও তার দল পিপিপি ফিরে ফিরে ক্ষমতায় এসেছে।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রারকে দুর্নীতির দায়ে সামরিক বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হবার পরেও তার বোন নির্বাচনে জিতে থাইল্যান্ডের ক্ষমতায় এসেছিলেন।

বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতেও গান্ধী পরিবার বা নেহেরু পরিবারের বাইরে গিয়ে কেউ রাজনীতিতে খুব বড় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি,গান্ধী পরিবারের রাজনীতি শেষ হয়ে যায় নি। ফিরে ফিরে ক্ষমতায় এসেছে।

আমাদের আশেপাশের অন্য দেশগুলোতে পরিবার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব নানা কারণেই জোরদার হয়েছে। ২০০৭-৮ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মাইনাস টু ফর্মুলায় খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার যে অপচেষ্টা হয় তা সাধারণ জনগণ রুখে দেন। সে সময় বি এন পি ও আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতাও এই মাইনাস টু ফর্মুলার পক্ষ নিলেও খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনার আত্মীয়রা দুর্দিনে দলের হাল ধরেন। এসব কারণেই দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদের আত্মীয়দের রাখা আমাদের অঞ্চলের বড় বড় দলগুলোর একটা রেওয়াজ বা নিরাপত্তা পদক্ষেপ হিসেবে দলের তৃণমূল কর্মীরা মনে করেন।

Comment As:

Comment (0)