No icon

কাসেম সোলাইমানির রক্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী নির্যাতিত মানুষকে পথ দেখাবে

অতি সম্প্রতি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ৪১ তম বিজয় বার্ষিকী অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আমেরিকার সাথে ইরানের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে এ সম্পর্কে রেডিও তেহরানকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ও অধ্যাপক আবদুল হাই শিকদার। তিনি বলেছেন, ইরান পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনা আমেরিকার কাপুরুষোচিত নৃশংস বর্বর অসভ্য কর্মকাণ্ড। এখানে আমেরিকার অবস্থান অবশ্যই ডাকাত এবং লুটেরাদের অবস্থান।

তিনি আরও বলেন, জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা খুব ছোটোখাটো জবাব মাত্র।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব আবদুল হাই শিকদার, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ৪১ তম বিজয় বার্ষিকী উদযাপিত হলো সম্প্রতি। তবে এবারের বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপনের কয়েকদিন আগে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সীমিত পর্যায়ে সামরিক সংঘাত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামি বিপ্লব ও ইরানকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন অনেকে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আবদুল হাই শিকদার: আপনার প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী। দেখুন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব শুধুমাত্র ইসলামি বিশ্বের জন্য একটা দৃষ্টান্ত তেমন নয়; আমি মনে সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ যারা সাম্রাজ্যবাদ এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সেইসব মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হচ্ছে ইরান। কাজেই ইরানের ৪১ তম বিপ্লব বার্ষিকীর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব অপরিসীম।

ইরানের ৪১ তম বিপ্লব বার্ষিকী

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে আমেরিকার আগ্রাসন- লালসা এবং তাদের সহযোগীরা সারা পৃথিবীকে দোজখ বানাতে চায়। বিশ্বকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে একে একটি  অমানবিক রক্তাক্ত গ্রহে পরিণত করতে চায়। আর এক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান শতভাগ ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে। ইরানের অবস্থান মানুষ ও মানববতার পক্ষে। কাজেই  আমেরিকার সাথে ইরানের যে সংঘর্ষ হয়েছে সেটাকে আমি শুধু  ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার সংঘর্ষ হিসেবে দেখতে চাই না। আমি মনে করি পৃথিবীর দেশে দেশে যারাই মুক্তির বাণী বহন করেছেন, যারাই সত্য ও ন্যায়ের পতাকা উড্ডীন করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই আজকে ইরানকে তাদের মডেল বলে মনে করে। কারণ ইরানের অমিত তেজ, উত্তাপ,দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা এবং তাদের মানবমুখী সংগ্রাম গোটা পৃথিবীর মানুষকে আলোড়িত করেছে।

আমি মনেকরি পৃথিবীর যেখানে মানুষ এবং মানবতা আছে সেখানে সবাই ইরানের জন্য দণ্ডায়মান। আর ইরানের উপর আঘাত করার অর্থ হচ্ছে মানুষ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং আঘাত করা। সেদিক থেকে আমি মনে করি  ইরান বিচ্ছিন্ন নয়। ইরানের সঙ্গে বিশ্বের শত শত কোটি মানুষের ভালোবাসা, শুভেচ্ছা ও নৈতিক সমর্থন রয়েছে। আর সেক্ষেত্রে আমেরিকা খুবই নিঃসঙ্গ।

রেডিও তেহরান:  জ্বি  জনাব আবদুল হাই শিকদার- আপনি যেকথাটি বলতে চাইলেন, সেকথার সূত্রধরে এগোলে এটা হয় যে,-আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত হয়েছে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব-রাজনীতিতে পড়বে? তাইতো..

শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি

আবদুল হাই শিকদার: জ্বি আমি তেমনটিই মনে করি। কারণ ইরান যে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছে তা দেখে পৃথিবীর দুর্বল জনমত যেখানে আছে তাঁরা নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাবে ইরানের কাছ থেকে। ইরান নীতি ও আদর্শের ক্ষেত্রে কখনও কারও কাছে মাথা নত করে না; তাদের অবস্থান যে অনড় সে বিষয়টি ঐ ঘটনায় আবার নতুন করে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে এবং তারা একে নন্দিত করেছে।

রেডিও তেহরান: এবারের বিপ্লব বার্ষিকীর সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, আমেরিকাকে আর ইরানে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হবে না। ইরান দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে রেখেছে। বিষয়টি ইরানের জন্য কী লাভ বয়ে এনেছে?

আবদুল হাই শিকদার: দেখুন, প্রতিটি জিনিষেরই একটি লাভ লোকসান আছে। অনেক বড় কিছু পাওয়ার জন্য ছোটো কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়। ইরান যা অর্জন করতে চাচ্ছে সেটি শুধু ইরানের একার অর্জন হবে না; সেই অর্জন হবে সারা বিশ্বের নির্যাতিত মজলুম মানুষের অর্জন। মজলুমের কাজে লাগবে। ফলে সেই বিশ্বমানবতার অর্জনের জন্য ইরান যে ত্যাগ স্বীকার করছে সেটি কখনও বৃথা যাবে না। এরমধ্য দিয়ে নতুন করে সত্য ও ন্যায়ের মশাল প্রজ্বলিত হবে।

রেডিও তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইরান ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে কিন্তু বিষয়টিকে অনেকে ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত অবস্থান থেকে দেখে থাকেন। তাদের অনেকেই সরাসরি শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেন। আপনি কী বলবেন?

আবদুল হাই শিকদার :  না; আমি মনে করি না ইরান কোনো সাম্প্রদায়িক দেশ। অবস্থানগত ও ভৌগোলিক কারণে ইরানের হয়তো বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী শিয়া মুসলমান। তবে শিয়া-সুন্নি বিরোধ একটা কৃত্রিম বিরোধ। আমার কাছে এই বিরোধ ইসলামের মৌলিক বিরোধ নয়। ইসলামের আক্বিদা এবং মৌলিক বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু না। ইরান কোনো সাম্প্রদায়িক কাজ করছে না। ইরান শুধুমাত্র শিয়াদের বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে আমি এমনটি মনে করি না। আমি বারবার বলেছি, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদলেহী ও তোষামোদকারী কিছু দালাল শাসকগোষ্ঠির অপরাধের জবাব হতে পারে তাদেরকে এখান থেকে উৎখাত করা। আর সেক্ষেত্রে একমাত্র ইরানকে দেখেছি যাদের কর্মকাণ্ড ওইসব শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে। ইরান ন্যায়ের পক্ষে থেকে মানবতার পক্ষে নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। ইরান এসব কাজ করেছে আদর্শিক জায়গা থেকে। এখানে যারা ইরানকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন উত্থাপন করে তারা কোনো না কোনোভাবে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সংযুক্ত বলে আমি মনে করি। তারা কোনো না কোনোভাবে মুসলিম উম্মাবিরোধী।

রেডিও তেহরান: জনাব আবদুল হাই শিকদার সবশেষে আপনার কাছে জানতে চাইব, আপনি জানেন যে, ইরানের আইআরজিসির কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছিল বাগদাদের কাছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। তিনি শহীদ হয়েছেন। তো জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করার বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি

আবদুল হাই শিকদার: জেনারেল কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড হচ্ছে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি। এটি আমেরিকার কাপুরুষোচিত নৃশংস বর্বর অসভ্য কর্মকাণ্ড। এখানে আমেরিকার অবস্থান অবশ্যই ডাকাতের অবস্থান। তাদের অবস্থান লুটেরাদের অবস্থান। জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা খুব ছোটোখাটো জবাব মাত্র। ইরান আমেরিকার মাটিতে গিয়ে কখনও আঘাত করে নি, আমেরিকার কোনো জেনারেলকে হত্যা করে নি। আমেরিকা গায়ে পড়ে পড়ে এসে বারবার ঝামেলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এরঅর্থ হচ্ছে আমেরিকা আসলে পৃথিবীতে আদর্শহীন ও ন্যায়নীতি বর্জিত একটি ভূখণ্ড চায়। আর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রচণ্ডভাবে তার প্রতিবাদ করেছে এবং করছে। ইরানের যা করা উচিত ছিল আমি তো মনে করি ইরান তা করে নি। এখন পৃথিবী ইরানের পক্ষে। কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর আমেরিকার বর্বরতা সর্বনিম্ম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর সামনে আবারও আমেরিকার মুখোশ ও ভণ্ডামি উন্মোচিত হয়ে গেছে।

আমি মনে করি কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং ঘৃণিত একটি কাজ। এরমধ্যে দিয়ে আমেরিকার চরিত্র আসলে কী তা ফুটে উঠেছে। আর এই ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে ইরান নতুনভাবে জেগে উঠেছে। আমি মনে করি যে, জেনারেল কাসেম সোলাইমানির রক্ত বৃথা যেতে পারে না। কাসেম সোলাইমানির রক্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর নির্যাতিত নিস্পেষিত মানুষকে পথ দেখাবে। আমি গভীরভাবে এটা বিশ্বাস করি। কাসেম সোলাইমানির মতো বীর প্রতিদিন জন্মায় না। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (আ.)সহ তার সঙ্গীসাথীদের হত্যার যে হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল-যে ঘটনাকে নিয়ে বলা হয় ইসলাম জিন্দা হোতাহে হার কারবালা কি বাদ। তেমনি আমিও মনে করি কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে নতুনভাবে হোসাইনি কাফেলা, ইমাম হোসেন আ. এর আদর্শ ও লক্ষ্য আরও বেশি করে উজ্জীবিত  ও প্রাণবন্ত হবে।#

Comment As:

Comment (0)