No icon

দুর্নীতির বোঝা জনগণের কাঁধে!

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াট। তবে চাহিদা না থাকায় গ্রীষ্মকালেই উৎপাদন করা হয়েছে গড়ে সাড়ে ৮ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সঞ্চালিত হয়েছে এর চেয়েও কম। শীতে এই চাহিদা ৭ হাজার মেগাওয়াটে নেমে যাবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে উৎপাদন সক্ষম প্রায় ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্রই অলস পড়ে থাকছে। তবে অব্যবহৃত থাকলেও এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে সরকারকে গুণতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ। এরপরও সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একের পর এক বিনা দরপত্রে দায়মুক্তি আইনে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। নানা দুর্নীতি-অনিয়মের হাত ধরে এসব কেন্দ্র থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। আর এই লোকসান ঠেকাতে কয়েক বছর ধরে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সর্বশেষ গত মাসে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে অপচয়, অদক্ষতা, দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করার আগ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একইসঙ্গে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি হওয়ায় রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম আর বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমতি দিয়ে সরকার বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে।

রেন্টাল-কুইক রেন্টালের নামে ঘাটে ঘাটে দুর্নীতিও হয়েছে। আর সেই টাকা ওঠানোর জন্য জনগণের পকেট কাটছে। দফায় দফায় দাম বাড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎখাতের এই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয়ের বোঝা এখন জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। অবিলম্বে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার দাবি জানিয়ে তারা বলছেন, বেশি দামের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন আর দরকার নেই। এগুলো বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম আর বাড়ানোর দরকার পড়বে না। তারা বলেন, ২০০৯-১০ সালে আপাত-সংকট কাটাতেই সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো চালু করেছিল। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিয়ে সরকার তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনেছে। কিন্তু নাগরিক সমাজের ভাষ্য অনুযায়ী, যেখানে চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, সেখানে এখন আর কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই অলস থাকছে। চাহিদা বিবেচনা না করে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দুই বছর আগে বেসরকারি খাতে বেশ কিছু ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে গুণতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ। ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) নামক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বোঝা টানতে হবে ১৫ বছর। ফলে গোটা বিদ্যুৎ খাতের জন্য বোঝা হয়ে উঠেছে এসব কেন্দ্র, যাদের কারও কারও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ৭৫ (অ্যাগ্রিকো পাওয়ার সলিউশন) থেকে ৮১ টাকা (প্যারামাউন্ট বিট্রাক এনার্জি)।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমান সরকার দৃশ্যমান সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও সেখানে কলঙ্কও ব্যাপক, যা ভবিষ্যতে বর্তমান নেতৃত্বকে বিচারিক সংকটে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ রকম তিনটি বিষয়ের একটি হচ্ছে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে বারবার উচ্চমূল্যের কুইক রেন্টাল ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নবায়ন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, জ্বালানি খরচের বিপরীতে অদক্ষ বহুসংখ্যক ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন-যেগুলো পিডিবির বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তৃতীয়ত, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের যাচাই-বাছাইহীন চুক্তিতে উৎপাদন না করেই বিশেষ বিশেষ কোম্পানিকে অতি উচ্চহারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যাওয়া। দেখা যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ রেন্টাল-কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর এ বিদ্যুৎ কেনায় প্রতিবছর মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। গত ছয় বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুণতে হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৪৮৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ ব্যয় বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রায় ৩৭ দশমিক ২২ শতাংশ। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের প্রধানতম আরেকটি সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে মানানসই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সক্ষমতা না থাকা এবং সঞ্চালনের সঙ্গে বিতরণ অবকাঠামোর ব্যাপক কারিগরি অক্ষমতা। একদিকে নির্মাণে অতি উচ্চ খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতারক ও দুর্নীতির ইন্টারফেসগুলো চুক্তির ফাঁকফোকরে লুটে নিচ্ছে, আরেক দিকে বিতরণ অবকাঠামোর অক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুতের পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না দেশের গ্রামীণ ও শহুরে নাগরিকরা।

বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের ওপর বিইআরসি’র গণশুনানিতে ভোক্তারা দাবি করেছেন, সবসময়ই তাদের চাওয়া উপেক্ষিত হয় শুনানিতে। বিইআরসি’র গণশুনানিকে তামাশা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তারা। এবার শুনানিতে পিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম ২৩ দশমিক ২৭ ভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বিরোধিতা করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের ভোক্তারা। তারা বলেছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখীবাজারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মানি না। এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সবকিছুতে এর প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করেন। কল কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বেন। বিদ্যুৎ খাতের ৫০ শতাংশ দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না বলে তারা মনে করেন।

এখন প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ৪ টাকা ৮৭ পয়সা। শুনানিতে বিইআরসি সুপারিশ করেছে এবার পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যেতে পারে ৯৩ পয়সা। অর্থাৎ কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ মেনে নিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দর হবে ৫ টাকা ৮০ পয়সা। এর সঙ্গে সঞ্চালন চার্জ আরো ৬ দশমিক ৯২ ভাগ মূল্য সমন্বয় করা হলে দাম আরো বাড়বে। খুচরা পর্যায়ে পাঠানোর সঙ্গে যোগ হবে বিতরণ চার্জ। এই বিতরণ চার্জ যোগ করেই কমিশন খুচরা বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে আসা প্রস্তাব এবং মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খুচরা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ দাম হতে পারে ৭ টাকা ২৬ পয়সার মতো। যদিও সরকার ভর্তুকির অংক ঠিক না করা পর্যন্ত এর সঠিক পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না।

কমিশন চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম শুনানিতে বলেছেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে ভোক্তাদের স্বার্থ দেখতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কমিশন মূল্যহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ শুনানির পর বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। তবে কখনো কখনো পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। ২০১০ সালের ১ মার্চ গ্রাহক পর্যায়ে ৬ দশমিক ৭ ভাগ বেড়েছিল। সেবার পাইকারিতে বাড়েনি। ২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গ্রাহক পর্যায়ে ৫ ভাগ এবং পাইকারিতে ১১ ভাগ বেড়েছিল। ২০১১ সালের ১ আগস্ট গ্রাহক পর্যায়ে বাড়েনি। তবে পাইকারিতে ৬ দশমিক ৬৬ ভাগ বাড়ানো হয়। ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে ১৩ দশমিক ২৫ ভাগ এবং পাইকারিতে ১৬ দশমিক ৭৯ ভাগ বাড়ানো হয়। ২০১২ সালের ১ সেপ্টেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ ভাগ এবং পাইকারিতে ১৭ ভাগ, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট গ্রাহক পর্যায়ে ২ দশমিক ৯৩ ভাগ বাড়ানো হয়। সেবার পাইকারিতে বাড়েনি। এরপর সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে ৫ দশমিক ৩ ভাগ বাড়ানো হয়। সেই সময়ও পাইকারিতে বাড়েনি। কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো-না বাড়ানো সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে কতটা ভর্তুকি দিতে সম্মত হবে, তার হিসাবে দামের অংক নির্ধারণ করা হবে। তবে উৎপাদন পর্যায়ের অর্ধেক ভর্তুকি দিলেও প্রস্তাবের অর্ধেক বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হবে।

বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, পিডিবি যে ঘাটতির কথা বলছে, তা সমন্বয় করতে ইউনিট প্রতি ৯৩ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার যে পরিমাণ ভর্তুকি দেবে তা বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাকি অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া হতে পারে। জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ক্যাব’র উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, পিডিবি তার মূল্যহার বৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেনি। সঙ্গত কারণে এই দাম বৃদ্ধি করা সমীচীন হবে না। তবে দাম বৃদ্ধি সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে। বিইআরসি যে মূল্যায়ন করেছে, তার ওপর নির্ভর করে সরকার ভর্তুকি দেবে। সরকারের ভর্তুকি দেয়ার পরই বলা যাবে প্রকৃত অর্থে কতটা দাম বাড়ছে। শুনানির শেষ দিনে তিনি আরো বলেন, শুনানিতে পেশকৃত বিবেচ্য বিষয়গুলোর সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন ও মানবাধিকার আইন বিবেচনায় নিতে হবে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ক্রয়ে প্রদত্ত ক্যাপাসিটি চার্জ মূল্যহারে সমন্বয়ে আপত্তি রয়েছে ক্যাব’র। উৎপাদন ব্যয়ে বিদ্যমান ঘাটতি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। সে ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় ও ব্যয় বৃদ্ধির ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা গণশুনানিতে প্রমাণিত হয়নি বলে এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন।

গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম আরো বলেন, স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে অনুসরণ ব্যতীত পাইকারি বিদ্যুতের মূলহার নির্ধারণ ন্যায্য যৌক্তিক হবে না। মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব তখনই যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত হবে যখন ঘাটতি যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত হবে। তিনি বলেন, পিডিবিকে ভোক্তারা বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় আদর্শিক মানদন্ড হিসেবে দেখতে চায়। এটি সরকারি সংস্থা। মুনাফা আহরণকারী কোম্পানি নয়। তার ট্যারিফ কস্ট প্লাস নয়, কস্টভিত্তিক হবে। ড. শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৭০ হাজার কোটি টাকা মজুদ আছে। বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে সাধারণ মানুষ খুব যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। ২০১০ সালের মার্চ থেকে এই পর্যন্ত আটবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, অপচয় দুর্নীতি, লুটপাটের মহোৎসব করা হচ্ছে। এর দায় কেনো জনগণ বহন করবে। আমি মনে করি দাম বাড়ানোর পরিবর্তে কমানোর যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। শুনানিতে বিজিএমইএ’র প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এবছর তৈরি পোশাক শিল্পের ৬৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে আরো অনেক কারখানা বন্ধের উপক্রম দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি লোক জড়িত। সরাসরি জড়িত ৪৪ লাখ মানুষ। এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে আরো বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান বিজিএমইএ’র এই প্রতিনিধি। শুনানিতে বিকেএমইএ’র প্রতিনিধি সজিব হোসেন বলেন, তাদের ১২শ’ কারখানার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৬শ’ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ালে অন্য কারখানাগুলোও দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই বলেও তিনি মনে করেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। সরকার বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য কুইক রেন্টাল করেছে। বিদ্যুতের ভুল নীতি ও দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা। তিনি বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান। সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স শুনানিতে বলেন, বিদ্যুৎ সেক্টরে দুর্নীতির হাঙ্গর ও কুমির রয়েছে। এখানে সর্বত্র দুর্নীতি। এখাতে ৫০ শতাংশ দুর্নীতিরোধ করতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ শুনানিতে বলেন, বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতি রয়েছে। এজন্য নিরপেক্ষ বিশেষ অডিট করা প্রয়োজন।

নজর নেই সিস্টেম লসে

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালনে প্রচুর সিস্টেম লস হলেও তা কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে লোকসানের অজুহাত তুলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। অথচ শুধুমাত্র সিস্টেম লস কমিয়ে আনলেও হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান বেঁচে যেত। সর্বশেষ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন মিলিয়ে সার্বিক সিস্টেম লস দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সিস্টেম লস আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিস্টেম লস কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। জানা গেছে, সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতের নিয়মিত সমন্বয় সভায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সিস্টেম লস পর্যালোচনা করে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে সিস্টেম লস কাক্সিক্ষত মাত্রার চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাওয়ার সেল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস ছিল বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি), ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর নর্দান পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সিস্টেম লস ৯ দশমিক ১২ শতাংশ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ৭ দশমিক ৩৭, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকোর) ৭ দশমিক ১১ এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে অর্থবছরটিতে বিতরণ সিস্টেম লস ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর সঞ্চালন সিস্টেম লস ছিল ৩ দশমিক ১০ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ পরিবহনে স্বাভাবিকভাবে কিছু অপচয় হয়। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি হলে এটির আর্থিক ক্ষতিও বাড়তে থাকে। এজন্য সিস্টেম লস এই মাত্রার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। আবার সিস্টেম লস কমাতে গিয়ে গ্রাহকদের ওভার বিলিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই। সরকারি হিসাবে, বিদ্যুতের সঞ্চালনব্যবস্থা উন্নত করতে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা (৩১ বিলিয়ন ডলার, প্রতি ডলার ৮০ টাকা করে) বিনিয়োগ দরকার। এই বিশাল বিনিয়োগের এখন পর্যন্ত নিশ্চয়তা পায়নি বিদ্যুতের সঞ্চালনব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দেশে ছয়টি বিতরণ সংস্থায় গ্রাহক হলো ৩ কোটি ৫০ লাখ। এদের মধ্যে ২ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। আরইবির অঞ্চলে রয়েছে কম ভোল্টেজ সমস্যা। এ সমস্যার অন্যতম কারণ ট্রান্সফরমারগুলোর আওতায় যে পরিমাণ গ্রাহক থাকার কথা, তার চেয়ে বেশি রয়েছে। এর ফলে এগুলো বাড়তি লোডে চলছে।

বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিতরণব্যবস্থা উন্নত করতে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা (৩৫ বিলিয়ন ডলার) প্রয়োজন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগানের এখনো কোনো নিশ্চয়তা পায়নি বিদ্যুৎ বিভাগ।

এ পরিস্থিতিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, ‘সরকারের একটি বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা আছে। কিন্তু এর বাইরে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিচ্ছে। আসলে কি আমদানিনির্ভর বেশি দামের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরও কি দরকার আছে? এত দামের বিদ্যুৎ দেশের অর্থনীতি বহন করতে পারবে কি না, সেটি বিবেচনা করা হচ্ছে না। এটি অগ্রহণযোগ্য।’

মানা হচ্ছে না পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান

নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনাও (পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান) মানা হচ্ছে না। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা গিয়ে দাঁড়াবে ৩৭ হাজার মেগাওয়াট। এ সময় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকবে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। মোট ক্ষমতার ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখা যাবে না। বর্তমানে সেখানে অলস বসে আছে প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র। আবার সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সক্ষমতা না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট স্থাপিত ক্ষমতার একটি অংশ উৎপাদন করা যায় না। এতে সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এ পরিস্থিতিতে গত মার্চে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দিতে বিদ্যুৎ বিভাগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেল সুপারিশ করেছে। তারপরও নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ সরকার আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)ভিত্তিক দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দিয়েছে। একটি পেয়েছে পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ শরাফাতের মালিকানাধীন ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড। এটির উৎপাদন ক্ষমতা ৫৮৪ মেগাওয়াট। গত ২৪ জুলাই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) হয়। অন্যটির অনুমোদন পেয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মাহমুদুল হকের প্রতিষ্ঠান আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড। পিডিবির সঙ্গে ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের এখনো পিপিএ হয়নি।

যদিও বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণে ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। আর স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর্ব শেষ হয় ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে। এরপরও এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে আনার শর্ত দিয়ে ২০১৭ সালের শেষের দিকে তেলভিত্তিক ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয় সরকার। এগুলোর স্থাপিত ক্ষমতা ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট ১৪ থেকে ২৫ টাকা। এগুলোর মধ্যে একটি ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র বাদে বাকিগুলো বেসরকারি মালিকানাধীন। এই কেন্দ্রগুলোও বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় ছিল না। আর পাওয়ার সেল বলছে, ২০৩০ সালের হিসাব অনুযায়ী চুক্তি হওয়া এবং নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাইরে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার নেই। কারণ, দেশে বিদ্যুতের তত চাহিদা নেই। পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেইন বলছেন, ‘বিনিয়োগকারীরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি পেতে অস্থির হয়ে পড়েছে। অথচ বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনার বাইরে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন নেই। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দিতে সরকারের কাছে আমরা সুপারিশ করেছি।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১০ বছরে আট বার বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এ খাতের সিস্টেম লস এবং দুর্নীতি রোধ করতে পারলেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না বরং কমানো যায়। কিন্তু নিয়ন্ত্রক কিংবা সেবা প্রদানকারী সংস্থা-কোম্পানিগুলো তাতে আগ্রহী না হয়ে সব সময় দামবৃদ্ধির পথে হাঁটতেই পছন্দ করে।

চাহিদা নেই, তবুও বাড়ছে রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

জ্বালানি, কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) ও বিদ্যুতের মূল্য বাবদ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অর্থ দেয় সরকার। এর ফলে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও কেন্দ্রের ভাড়া দিতে হয়। ১০০ মেগাওয়াট একটি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে বছরে গড়ে শুধু কেন্দ্রভাড়াই দিতে হয় ৯০ কোটি টাকার বেশি। ফলে কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করে বসিয়ে রাখলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্রভাড়া দিতে গিয়ে সরকারের লোকসান বাড়ে। তবে সরকারি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে কেন্দ্রভাড়া দেওয়া লাগে না।

২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মহাপরিকল্পনায় ২০১৫ সাল নাগাদ দেশে বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছিল ১০ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট। তবে সে হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়েনি। মূলত শিল্প খাতের শ্লথ চাহিদা সামগ্রিকভাবে বিদ্যুতের চাহিদার এ প্রক্ষেপণে প্রভাব ফেলেছে।

২০১৬ সালের মহাপরিকল্পনায় দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে ২০১৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা ৭ হাজার ৮১৭ মেগাওয়াটে গিয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে সাব স্টেশন পর্যায়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ৮ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের মতো।

তারপরও বেসরকারি খাতে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন হতো না। প্রায় এক দশক আগে কুইক রেন্টাল চালুর যেসব যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে, এখনো একই যুক্তিতে স্বল্পমেয়াদি নতুন এসব কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। একইভাবে আগের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোরও চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে। এগুলো খাতটির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে উৎপাদনে রয়েছে বেসরকারি খাতের ৩২টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৮। বাকিগুলো রেন্টাল। এসব কেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় লোকসান বাড়ছে বিপিডিবির। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দিয়েছে ৪ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহে বিশেষ আইন করা হয় ২০১০ সালে। উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তিনবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আইনটির। এর আওতায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নতুন নতুন প্রকল্পও। অনেক বড় প্রকল্পও রয়েছে এর মধ্যে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি। এতে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়। তার পরও বিশেষ আইনে প্রকল্প অনুমোদন পাচ্ছে। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে বিশেষ এ আইনের অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পের সংখ্যা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০ সালের ২ অক্টোবর জাতীয় সংসদে দুই বছরের জন্য পাস হয়। ওই বছরের ১২ অক্টোবর এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনটি সংশোধন করে আরো দুই বছর বাড়ানো হয়। এরপর ২০১৪ সালে দ্বিতীয় দফায় আরো চার বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০১৮ সালে এর মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়িয়ে জাতীয় সংসদে বিল পাস করা হয়। অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত এ আইনের আওতায় যেকোনো প্রকল্প বরাদ্দ বা অনুমোদন দিতে পারবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। আইনে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাক না কেন, এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। এ আইনের অধীন কৃত বা কৃত বলে বিবেচিত কোনো কাজ, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বিশেষ আইনের আওতায় গত নয় বছরে নতুন ৯৬টি ছোট-বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। নয় বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৩টিতে। কয়লাভিত্তিক ২০টিসহ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক আরো অর্ধশতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। আইনটির আওতায় দীর্ঘমেয়াদি কয়লাভিত্তিক কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পই এখন পর্যন্ত উৎপাদনে আসেনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, অল্প সময়ের কাজের জন্য বিশেষ আইন ঠিক আছে। কিন্তু যে প্রকল্পটা তিন থেকে পাঁচ বছরের, সেটার জন্য কেন উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে না? বিশেষ আইন আছে বলে সব প্রকল্প দায়মুক্তি পদ্ধতিতে কেন করতে হবে?

বিদ্যুৎখাত নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ কেন?

দেশে দফায় দফায় বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। তবে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্নীতিকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সরকারের সঙ্গে জড়িত বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে সুবিধা দিতে গিয়ে, তাদের লাভের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় এত বেশি বেড়ে গেছে। যার দায় বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে রেন্টাল-কুইক রেন্টালের নামে যা হয়েছে একে সাধারণ কথায় ‘দুর্নীতি’ বললেও কম বলা হবে। বাতিল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে তার মাধ্যমে টাকা হাতানো হয়েছে রেন্টালে। বিদেশের ব্যবহৃত, অতি পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমস্যা হচ্ছে এগুলো তেল টানে বেশি, সেই তুলনায় বিদ্যুৎ দেয় অনেক কম। খুবই কম দামের মেশিনপত্র এ কারণেই ক্ষতিকর। রেন্টালে যে পুরনো যন্ত্রপাতি আসছে এটা সরকারের কর্তাব্যক্তিরা স্বীকারও করেছেন বেশ কয়েকবার।

পিডিবির দেয়া তথ্য মতেই, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য আমদানি করা যন্ত্রপাতির শতকরা ৮০ ভাগই হচ্ছে পুরনো। বিশেষজ্ঞরা জানান, যেখানে নতুন একটি যন্ত্রের দাম এক হাজার কোটি টাকা, আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা সেটা এনেছেন মাত্র ২০০ কোটি টাকায়। ফলে ব্যয় তাদের কমেছে। লাভও হয়েছে। যারা যন্ত্রের কাগজপত্র তৈরি থেকে নীতিগত অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত সবাই এর অংশীদার।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করায় নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। ১৩টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ব্যবহার করার কারণে ১২৭ কোটি টাকা জরিমানাও করেছিল পিডিবি। আবার তাদের মুক্ত করার জন্য তেলের ‘দাহ্য ক্ষমতা কম’ প্রমাণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।

এক বছরে পিডিবির ব্যয় বেড়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালন ব্যয় এক বছরে বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। সেই সাথে বাড়ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ সামগ্রিক ব্যয়। আর এ কারণেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, পিডিবির উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এতে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। আর এ অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধির দায় চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে জনগণের ঘাড়ে।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক বিডি রহমত উল্লাহ বলছেন, পিডিবির হিসাব মতে, ৬২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে গ্যাসের মাধ্যমে। এতে পিডিবির সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কোনোক্রমেই সাড়ে ৩ টাকা থেকে ৪ টাকার ওপরে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বর্তমানে বাণিজ্যিকে বিদ্যুতের মূল্য নেয়া হচ্ছে ১৩ টাকার ওপরে। আর গড়ে মূল্য নেয়া হচ্ছে প্রায় ৭ টাকা। এ ব্যবধানের প্রধান কারণ হলো অযৌক্তিক ব্যয় বাড়ানো। তিনি জানান, সরকারের দাবি অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে প্রায় ২২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বিদ্যুৎ বিতরণ গড়ে আট হাজার মেগাওয়াটের বেশি হচ্ছে না। এতে দেখা যায়, উৎপাদন ক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ বিতরণ করতে হচ্ছে। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। আর এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশির ভাগই বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র। দায়মুক্তি দিয়ে টেন্ডার ছাড়াই এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ‘আমার কোনোভাবেই বুঝে আসে না, যেখানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেয়া যাচ্ছে না, এর ওপর কেন নতুন করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। আর এভাবে কেনই বা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।’ এর ফলে পিডিবির অযৌক্তিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আর এ অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে জনগণের ঘাড়ে বাড়তি মূল্য চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

পিডিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই বসিয়ে রাখা হচ্ছে। বিপরীতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। আবার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না করে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। বিপরীতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে বেশি মূল্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। এভাবে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

পিডিবির এক হিসাব মতে, নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে পিডিবির পরিচালন ব্যয় ছিল ১৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা, আগামী বছরে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) এ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। আর মেরামত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বেশি। সেই সাথে এক বছরে জনবল ব্যয় বাড়বে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। যেমন নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে জনবল ব্যয় হয়েছিল ৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। আগামী বছরের জন্য প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে পিডিবির ঘাটতি বেড়ে যাবে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি মেটানোর জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে; অন্যথায় লোকসান আরো বেড়ে যাবে। অর্থাৎ পিডিবির লোকসান কমাতে গিয়ে তাদের অপকর্মের সকল দায় চাপানো হচ্ছে সাধারণ জনগণের ওপর। সাধারণ মানুষকে এখন আরো বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হবে।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)

Comment As:

Comment (0)