No icon

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-অধিদফতর দ্বন্দ্ব: দায় কার

করোনা দুর্যোগের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে শুরু থেকেই। চার মাস পর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের বিপরীতে সমন্বয়হীনতার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং একে অপরকে দোষারোপ করার বিষয়টি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনা যাই হোক না কেন, এই বিপদের সময়ে এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। মানুষ এমনিতেই ভোগান্তিতে রয়েছে, এসব করে আর ভোগান্তি বাড়ানো যাবে না। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে।

প্রসঙ্গত, করোনা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কাজে সমন্বয়হীনতা থাকলেও সেটা প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য হয়ে আসে সম্প্রতি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে অধিদফতর থেকে অনুমোদন পাওয়া রিজেন্ট হাসপাতাল এবং নমুনা সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান জেকেজির নজীরবিহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রতারণার পর।

স্বাস্থ্য অধিদফতর অনুমোদিত করোনার নমুনা পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান জেকেজি (জোবেদা খাতুন সার্বজনীন হেলথ কেয়ার) এর ২৭ হাজার নমুনার মধ্য প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার নমুনাই ছিল ভুয়া। আর এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করেছে তার স্বামী আরিফ চৌধুরী ও জেকেজির অন্য কর্মীদের। একইসঙ্গে গত ছয় জুলাই উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযান চালায় র‌্যাব। জানা যায়, ২০১৪ সালের পর এই হাসপাতালটির লাইসেন্স আর অনুমোদন করা হয়নি। অর্থাৎ একটি অনুমোদনহীন হাসপাতালকে করোনা টেস্টের অনুমোদন দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। একইসঙ্গে হাসপাতালটি টেস্ট না করেই কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ও ‘নেগেটিভ’ সনদ দিতো বলেও অভিযানে উঠে আসে।

গত ৯ জুলাই লাইসেন্সের মেয়াদ নবায়ন না করেই রিজেন্ট হাসপাতাল কীভাবে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সনদ পেয়েছে অধিদফতরের কাছে তার ব্যাখ্যা তলব করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সেদিনই অধিদফতরের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “‘উপরের কেউ’ বলার কারণে রিজেন্টকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।”

গত ১১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর সে সময় রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে। এই চুক্তির আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে চিনতেন না, পরিচয় থাকা তো দূরের কথা। আর এর পরিপ্রেক্ষিতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের কাছে এর ব্যাখ্যা চেয়েছে। ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন আগামী তিন কর্যদিবসের মধ্যে তার ‘সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা’ দিতে বলেছে মন্ত্রণালয়।

মার্চ মাসে যখন কোনও হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি নিচ্ছিল না, তখন রিজেন্ট হাসপাতাল কোভিড ডেডিকেটেড হিসেবে চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর সে সময় রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে। এই চুক্তির আগে অধিদফতরের মহাপরিচালক রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমকে চিনতেন না। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সত্যটা বের হয়ে আসুক, এটা আমরাও চাই। কী করে, কিসের ভিত্তিতে রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে সেটা প্রকাশিত হোক।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কেউই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। আমি ব্যাখ্যা দেবো, তবে লিখিত নির্দেশনাই যে সবসময় হয় তা নয়। মৌখিকভাবেও অনেক সময় অনেক নির্দেশনা দেওয়া হয়। আর আমি আমার পরিচালককে বিশ্বাস করবো। আমার কথার পক্ষে যে প্রমাণ রয়েছে, সেটা দেবো।’

এদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'তিনি কী করে এ ধরনের ব্যাখ্যা দিলেন সেটা আমরা জানি না। একইসঙ্গে মন্ত্রী স্যার (স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক) আমাকে বলেছেন, মন্ত্রণালয় রিজেন্ট হাসপাতালের চুক্তির বিষয়ে কিছু জানে না, তাদের অবহিত করা হয়নি।’

তবে কেবল অধিদফতর সবকিছু করেছে মন্ত্রণালয় কিছুই করেনি, জানে না—এ ধারণা একেবারেই ঠিক নয় বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান অধিদফতর সূত্র। অধিদফতরের কয়েকটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবের মাধ্যমে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ অধিদফতরে যাতায়াত শুরু করে। তার সুপারিশেই হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয় অধিদফতরের।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ( বিএমএ) এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মনে করি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছাড়া অধিদফতর কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সচিব পদমর্যাদার কেউ এর সঙ্গে জড়িত, তার সঙ্গে জড়িত অন্যকেউ। নয়তো যে হাসপাতালের নাম সেভাবে কেউ জানে না, উপর লেভেলের কারও ইঙ্গিত ছাড়া ডিজি এতে রাজি হয়ে যাবেন-সচিব মন্ত্রী সবাই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে থাকবেন—এটা হতে পারে না।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা এখন একে অরপকে ব্লেম দিচ্ছে—সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন, এই ব্লেম গেইম থেকে বের হয়ে আসা উচিত। তাদের এই আচরণের কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে, যেটা করোনার সময়ে হওয়া উচিত নয়। তাদের এখন সমন্বিতভাবে কাজ করা দরকার, নয়তো মানুষের জন্য সরকার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে সেগুলো ব্যর্থ হয়ে যাবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা একেবারেই কাম্য নয়, স্বাস্থ্যের দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কেন সমন্বয় থাকবে না, সেটাই বিস্ময়কর। কিন্তু যাই হোক না কেন এটা সাধারণ মানুষের জন্য ভালো কিছু হচ্ছে না। এই সময়ের মতো পরিস্থিতিতে এ থেকে বের হয়ে আসা উচিত।’ আর মন্ত্রণালয় জানে না এমন কিছু নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই ক্রান্তিলগ্নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আগের সচিব, অতিরিক্ত সচিবকে কেন বদলি করা হলো? যারা আগে থেকে কাজ করছে তাদের বদলি করতে হচ্ছে, অবসস্থাটা কত খারাপ হয়েছে।’

Comment As:

Comment (0)