No icon

বিজিবি প্রধান কার চাকুরি করেন, বাংলাদেশের না ভারতের

পিনাকী ভট্টচার্য

ভারতীয়রা এবং আশ্চর্যজনকভাবে কিছু বাংলাদেশী নাগরিকও বলে বাংলাদেশীরা চোরাচালানে সংযুক্ত থাকার জন্য ও অন্য নানা কারণে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে, আর সে জন্যই বিএসএফ গুলি ছোঁড়ে। তাই তাদের যুক্তি, বিএসএফ’কে বাংলাদেশীদের গুলি করে মারার জন্য দোষ দেয়া যায় না।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস সম্প্রতি বলেছেন, সীমান্তে প্রতিনিয়তই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। এসব বন্ধ না করা গেলে হত্যা বন্ধ হবে না।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের বিজিবি মহাপরিচালক বলেছিলেন সীমান্ত হত্যাকাণ্ড হচ্ছেই না। অবাক হচ্ছেন? আসেন আমরা প্রথম আলোতে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এ জেনারেল শাফিনুলের সাক্ষাতকারের একটা অংশ দেখি। তিনি বলছেন, “বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো সীমান্তে হচ্ছে না। এটা ভারতের অভ্যন্তরে ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার ভেতরে হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এরা বাংলাদেশি নাগরিক, আমাদের দেশে হয়তোবা পরিবার-পরিজন আছে, আমরা তখন চেষ্টা করি যখন খবর পাই, তাকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা। এটা একটা মানবিক দিক থেকে আমরা করে থাকি। এখন সীমান্তের ১৫-২০ কিলোমিটার ভেতরে যে হত্যাকাণ্ড হয়, সেটিকে কি আমরা সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বলতে পারি?”

তার মানে বিজিবির কাছে এটা সীমান্ত হত্যাই নয়। রিভা গাঙ্গুলি এটাকে সীমান্ত হত্যা বলছে কিন্তু বিজিবি প্রধান সেটাকে সীমান্ত হত্যা বলতে নারাজ। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেটাকে সীমান্ত হত্যা বলছে কিন্তু বাংলাদেশের বাহিনী বিজিবির কাছে সেটা সীমান্ত হত্যা নয়। আমি সম্প্রতি ডয়েচে ভেলেতে প্রকাশিত একটা সংবাদের অংশ তুলে দিচ্ছি।

“সম্প্রতি ঢাকা সফরে আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘‘আপনারা আমাদের বন্ধু মানুষ। এই বন্ধুদের মধ্যে কিলিং হওয়া ঠিক না।’’ জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সীমান্ত হত্যা বন্ধে ‘চেষ্টা চালাবেন’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন। শ্রিংলাও জানে এটা সীমান্ত হত্যা কিন্তু বিজিবি মহাপরিচালক এটাকে সীমান্ত হত্যা হিসেবে মানেন না।
সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটেছে গত ১৯ সেপ্টেম্বর। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সম্মেলন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা বলেন, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে হত্যার হার শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি বাংলাদেশকে।

তার মানে রাকেশ আস্থানাও জানে এটা সীমান্ত হত্যা কিন্তু বিজিবি প্রধান এটা জানেনা। যদিও সেই বৈঠকের আলোচ্যসূচির এক নম্বরে ছিল “সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি/হত্যা/আহত করা।”
তবে সেই সংবাদ সম্মেলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম আরও একটা নতুন তত্ত্ব হাজির করেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা’ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। সে কারণে

হত্যার ঘটনা ঘটছে।

২০২০ সালেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবি মহাপরিচালক বলেছিলেন, “বিজিবি অবৈধভাবে কাউকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেবে না, ঢুকতেও দেবে না।”

তাহলে সাফিনুল ইসলামের কথামতো ‘সন্ত্রাসীরা’ নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়ছে কীভাবে? বিজিবির তো অবৈধভাবে কাউকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেয়ার কথা নয়। বিজিবি কি তাহলে সীমান্তে পাহারা দেয় না?

ভারতীয়রা যেটাকে সীমান্ত হত্যা বলছে বিজিবি প্রধান অবলীলায় সেটাকে অস্বীকার করছে। পোপের চাইতেও বেশী ক্যাথলিক বিজিবি প্রধান আসলে কার চাকরি করে? সে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চাকরি করে নাকি ভারতের দালালি করে ফ্রিতে?

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে নেপালের একজন নাগরিককে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করার পর নেপালিদের প্রতিবাদের মুখে ভারত মাফ চাইতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের সহস্রাধিক নাগরিককে হাসিনা আমলে সীমান্তে জীবন দিতে হলেও হাসিনা দেশের নাগরিককে রক্ষার জন্য কিছুই করেননি।

সীমান্ত অঞ্চলের মানুষেষর জীবনযাত্রা যাতে বাঁধাগ্রস্থ না হয় সেজন্য ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে, এপ্রিলে কোলকাতাতে আর মে মাসে করাচীতে ভারত উপ-মহাদেশের বিভাজিত দুই অংশের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে একটি দীর্ঘ চুক্তি সম্পাদন করেন। তার নাম ইন্টার ডোমিনিয়ন এগ্রিমেন্টস। এই এগ্রিমেন্টে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার পরস্পর নির্ভরতার বিষয়টা বিবেচনায় নিয়েই পাকিস্তান এবং ভারতের সীমান্তে বসবাসকারীদের অবাধে সীমান্তের একপাশ থেকে অন্যপাশ অতিক্রম করার এবং নিকটবর্তী বাজারগুলোতে তাদের উৎপন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো বহন করার অধিকার বা অনুমতি দেয়া হয়।
এই চুক্তির কোন মেয়াদ ছিলনা। তাই এই চুক্তি এখনো বলবৎ আছে বলে ধরে নিতে হবে। সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে দুই পাড়ের মানুষের অবাধে বাণিজ্য করার অধিকার কেড়ে নিয়ে এই চুক্তির একতরফা বরখেলাপ করেছে ভারত।

এই চুক্তি এখনো বলবৎ থাকার কারণেই সীমান্ত অতিক্রম এবং স্থানীয় বাণিজ্যকে কোনভাবেই চোরাচালান বলা যাবেনা। তাই ভারতীয়দের চোরাচালান বন্ধে গুলি করার বৈধতা যারা দিতে চান তারা আশা করি তাদের কুযুক্তি বন্ধ করবেন।

বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই সীমান্ত হত্যা বন্ধে সীমান্ত এলাকায় অবাধ বাণিজ্য আর চলাচলের গ্যারান্টি যেই ইন্টার ডোমিনিয়ন এগ্রিমেন্টে দেয়া হয়েছিলো তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা উত্থাপন করতে হবে। তবে এই ভারতের দালাল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার সীমান্ত হত্যা কখনোই বন্ধ করতে পারবে না। কারণ ভারতের তাবেদার হয়ে যাদের ক্ষমতা রক্ষা করতে হয় তাদের দেশের জনগণের স্বার্থ নিয়ে ভাবার সময় বা প্রয়োজন নেই।

Comment As:

Comment (0)