No icon

বঙ্গভঙ্গ থেকেই বাংলাদেশের প্রবর্তনা

আরিফুল হক

এটা অক্টোবর মাস। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গ বিভাজন কার্যকর হয়! প্রত্যেক জাতির জীবনে এমন কতগুলো দিন আসে, যে দিনগুলো কালের অতলে হারিয়ে যায়না, ধ্রুবতারার মত মধ্যগগনে স্থির হয়ে থাকে। জাতিকে অন্ধকারে পথ চলতে সাহায্য করে। বঙ্গ বিভাগ যা বঙ্গভঙ্গ নামে সমধিক পরিচিত; বাংলাদেশী জাতীর জীবনে তেমনি একটি ধ্রুবতারা। যা দিক হারা জাতিকে পথের নিশানা বলে দেয়, সঠিক ঠিকানায় পৌঁছতে সাহায্য করে। তাই বঙ্গভঙ্গের তাৎপর্য অনুধাবন করা আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কি এই বঙ্গভঙ্গ?

প্রশাসনিক সুবিধার জন্য, ভারতে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন বৃহদায়তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে জন্ম হয় পূর্ববঙ্গ আসাম নামক নতুন প্রদেশের যার রাজধানী হয় ঢাকায়। সাদামাটা ভাবে দেখলে এটাই ছিল বঙ্গ ভঙ্গের ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাস তো শুধু অতীত রোমন্থন নয়। ইতিহাস অতীত ও বর্তমানের কথোপকথন। সেই কথোপকথন শুনতে হলে ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে হবে, বর্তমানের জন্য তার প্রাসঙ্গিকতা নির্ণয় করতে হবে; তবেই সেই ইতিহাস ভাবীকালের ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠবে।

ব্রিটিশ আমলে বেঙ্গল, ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সির এলাকা ছিল আসাম, পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার, এবং ছোট নাগপুর অঞ্চল নিয়ে! ২ লক্ষ ৪৬ হাজার ৭৮৬ বর্গমাইলের এই বিশাল অঞ্চল জুড়ে সুষ্ঠু প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা দুরূহ কাজ অনুভূত হওয়ায়, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে ভাগ করার কথা চিন্তা করেন। ১৮৭৪ সালের ১২ই অক্টোবর তারা প্রথমবার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ১০টি জেলাকে আলাদা করে পৃথক আসাম প্রদেশ গঠন করেন। জেলাগুলো ছিল কামরূপ, দারাং, নওগা, শিবসাগর, লক্ষ্মীপুর, গাড়োহিলস, খাসিয়া এন্ড জয়ন্তিয়া হিলস, নাগাহিলস, কাছাড় এবং গোয়াল পাড়া। এই বছরই এক সরকারি নির্দেশ বলে সিলেট জেলাকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিছুদিন পর লুসাই পার্বত্য অঞ্চলকেও আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির আয়তন গিয়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল, যা ছিল জার্মানির থেকেও বড় এবং লোকসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৮ মিলিয়ন; যা ছিল ব্রিটিশ শাসিত অন্যান্য প্রদেশগুলোর চাইতে অনেক বেশি। কিন্তু তখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তই ছিল।

এরপর ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি কে আবার দু ভাগে ভাগ করতে চাইলেন। ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে লর্ড কার্জন বঙ্গ বিভাগের খসড়া তৈরি করেন, ১৯০৫ সালের জুন মাসে ভারত সচিব সেটা অনুমোদন দেন। ১৯০৫ সালের ৫ জুলাই বঙ্গ বিভাগ প্রচারিত হয়, ১লা সেপ্টেম্বর প্রদেশ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্যকর করা হয়।

অবিভক্ত বাংলার ১৪টি জেলা, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের সবকয়টি জেলা ও দুটি দেশীয় রাজ্য যেমন ত্রিপুরা, পার্বত্য ত্রিপুরা ও কুচবিহার নিয়ে নতুন প্রদেশের সীমা নির্ধারিত হয়। তাতে নতুন প্রদেশের আয়তন দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার ৫৪০ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ৩ কোটি ১০ লাখ। যার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ। নতুন প্রদেশটির নামকরণ করা হয় পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশ।

ব্রিটিশ সরকারের নতুন প্রদেশ করার উদ্দেশ্য ছিল বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। কিন্তু পূর্ববঙ্গের অবহেলিত মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় এই বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তাদের ভাগ্য উন্নয়নের শুভ সূচনার ইঙ্গিত লক্ষ্য করলেন। তারা ভেবেছিলেন, নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, কৃষি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গের উন্নতি তরান্বিত হবে ফলে তারা লাভবান হবেন।

প্রকৃতপক্ষেই বঙ্গভঙ্গের প্রাক্কালে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় এবং অবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। তখন পরিস্থিতি এমনি ছিল যে জমিদার মানেই বর্ণ হিন্দু, খাতক মুসলমান আর যোতদার হিন্দু, চাষা মুসলমান। উকিল-ডাক্তার হিন্দু, মক্কেল-রুগী  মুসলমান। অফিসার হিন্দু আর ঝাড়ুদার, চৌকিদার, পিয়ন, চাপরাশি মুসলমান। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা ছিল এক অমানবিক ঘটনা। শতাব্দীব্যাপী দুটা জাতি একসঙ্গে পাশাপাশি বাস করেছে; অথচ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে একশ্রেণী চালিয়েছে নির্যাতন এবং অপরজন হয়েছে শুধুই নির্যাতিত, অধঃপতিত।

বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার ফলে নির্যাতিত মুসলমানরা ভাবলেন, ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর চালু হলে তাদের ভাগ্য ফিরাবার সুযোগ আসবে। কোর্ট কাচারি ঢাকাতেই হবে, তাদের কলকাতায় দৌড়াতে হবেনা। রাস্তাঘাটের উন্নতি হবে। শিক্ষার উন্নতি হবে। নতুন নতুন স্কুল কলেজ হবে। ঢাকা চট্টগ্রামে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। তারা কলকাতার শোষণবঞ্চনা থেকে মুক্ত হবে।

গুড়ে বালি!

ফুসে উঠলেন দুই বঙ্গের কায়েমি স্বার্থবাদী বর্ণ হিন্দু বাবু সম্প্রদায়। জমিদার বাবুরা ভাবলেন, বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিম প্রজাপ্রধান পূর্ববঙ্গের মানুষ শিক্ষিত এবং সচেতন হয়ে উঠলে জমিদারি শাসন শোষণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এছাড়াও ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুরা ভাবলেন, ধর্মগত ভাবে তারা সংখ্যালঘু জনসমষ্টিতে পরিণত হওয়ায় নতুন প্রদেশে তাদের কায়েমি স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে!

সুতরাং বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার সাথে সাথেই তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক সরল চট্টোপাধ্যায় তার ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমবিকাশ’ বইতে লিখেছেন, “বঙ্গ বিভাগ পরিকল্পনা প্রকাশিত হওয়ার পর অসংখ্য সভাসমিতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯০৩ এর ডিসেম্বর থেকে ১৯০৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, ছোট বড় এবং অতি বিশাল প্রায় দুহাজার বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় বঙ্গের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন।” কবি রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর রাখী দিবস হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ক্রমে ক্রমে সভা সমিতি এবং বিক্ষোভ প্রদর্শনের আন্দোলন, স্বদেশী নাম গ্রহণ করে বিলাতি পণ্য বর্জন এবং অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। এবং সাথে সাথে সুরেন ব্যানার্জি, বারীন ঘোষ, অরবিন্দ ঘোষ, তিলক প্রমুখ চরমপন্থি কংগ্রেস নেতাদের নেতৃত্বে এই স্বদেশী আন্দোলন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। এই স্বদেশী আন্দোলনে পূর্ববঙ্গের নিম্নবর্ণের হিন্দুশ্রেনীর আশানুরূপ সাড়া না দেয়ায় বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় এক কৌশল অবলম্বন করেন। তারা বঙ্গকে ‘কালীমাতার’ রূপ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বঙ্কিম চন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ কে জাতীয় শ্লোগানে রূপান্তরিত করেন এবং বর্গী শিবাজীকে জাতীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে স্বদেশী আন্দোলন পুরাপুরি হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন হিসাবে গড়ে ওঠে, যা ছিল ঘোর সাম্প্রদায়িক এবং পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগুরু মানুষের স্বার্থবিরোধী আন্দোলন। ভারতীয় গবেষক অমলেন্দু দে তার ‘বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বইতে লিখেছেন, “কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্র নন্দী এক প্রতিবাদ সভায় বলিলেন, নতুন প্রদেশে মুসলমানেরা হবে সংখ্যাগুরু আর বাঙালিরা (মানে হিন্দু) হবে সংখ্যা লঘিষ্ঠ, ফলে স্বদেশে আমরা প্রবাসী হব। আমার জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তায় আমি উদ্বিগ্ন।”

নতুন প্রদেশের গতিধারা যখন সবেমাত্র শুরু হয়েছিল, সেই মুহূর্তেই মুসলমানদের আশায় গুড়ে বালি ছিটিয়ে সবকিছু তছনছ করে দেয়া হল। আইনজীবী লেখক বিমলানন্দ শাসমল তার ‘ভারত কি করে ভাগ হল’ বইতে লিখেছেন, “বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ছিল সন্দেহাতীত ভাবে মুসলমান বিরোধী এবং গভীরভাবে মুসলমান স্বার্থের পরিপন্থী। এই আন্দোলনের তাগিদে যে সকল সন্ত্রাসবাদী বিপ্লববাদী নেতা কর্মক্ষেত্রে প্রকাশিত হলেন, তারা সকলেই ছিলেন গভীর ভাবে মুসলমান বিরোধী। মওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ইণ্ডিয়া উইন্স ফ্রীডম’ বইতে লিখেছেন, বিপ্লববাদীরা যে শ্রেণী থেকেই আসুক না কেন প্রত্যেকেই ছিলেন মুসলমান বিরোধী।”

আমরা ভুলে গেলাম!

বঙ্গভঙ্গের পথ ধরেই মুসলমানদের জাতীয় চেতনার স্ফুরণ ঘটে। বঙ্গভঙ্গের পথ ধরেই মুসলিম হোমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। বঙ্গভঙ্গের পথ ধরেই ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ হয় বাংলাদেশ নামক ৯৯% মুসলমানের নতুন ভূখণ্ডের অভ্যুদয় হয়। অতএব বঙ্গভঙ্গ থেকেই বাংলাদেশের প্রবর্তনা। বঙ্গভঙ্গ ই বাংলাভাষী মুসলমানদের চেতনার সেই সুউচ্চ কুতুব মিনার, যার চূড়ায় দাঁড়ালে আমরা শত্রু মিত্র চিনতে পারতাম, সঠিক পথের দিকনির্দেশনা পেতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আধিপত্যবাদীদের দেশীয় অনুচররা বঙ্গভঙ্গ মিনারের চারপাশে দেয়াল তুলে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস আজ অন্ধকারে ঢাকা।

স্বাধীন বাংলাদেশের জমিনে আজ আবার ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। স্বাধীন দেশের জলসীমা তাদের দখলে, সমুদ্রসীমা তাদের দখলে, রাস্তাঘাট তাদের দখলে, সীমান্ত অরক্ষিত, দেশের ভিতরে তাদের পোষা ভোট বিহীন সরকার না চাইতেই দেশের সব কিছু প্রভুর হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের জনগণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানরা আবার বঙ্গভঙ্গ পূর্ব জাজিম তোলা আসনে বসার ভাগ্যকে বরণ করে নেবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। চিন্তাই করছেনা এর পরিণতি কি!

আল কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন:-

‘স্মরণ কর সেই সময়ের কথা, তখন তোমরা ছিলে খুবই অল্পসংখ্যক, জমিনে তোমাদেরকে প্রভাব প্রতিপত্তিহীন মনে করা হইত। তোমরা ভয় করিতেছিলে যে লোকেরা তোমাদের না নিশ্চিহ্ন করিয়া দেয়। পরে আল্লাহ তোমাদেরকে আশ্রয়স্থল যোগাড় করিয়া দিলেন, নিজের দেয়া সাহায্য দ্বারা তোমাদের হাত কে মজবুত করিয়া দিলেন, এবং তোমাদেরকে উত্তম রেজেক দান করিলেন, এই আশায় যে সম্ভবত তোমরা শোকর জ্ঞাপনকারী হইবে’। (আনফাল:২৬)

Comment As:

Comment (0)