No icon

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রেজুলেশন গৃহীত

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শিরোনামে একটি রেজুলেশন গ্রহন করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি। এই রেজুলেশনে নির্যাতিত ও নিপীড়িত রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে বুধবার বিপুল ভোটে এ রেজুলেশন গৃহীত হল। রেজুলেশনটি যৌথভাবে উত্থাপন করেছিল ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দেয় ১৩৫টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র ১০টি দেশ। ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘে বিভিন্ন পর্যায়ে এনিয়ে টানা চতুর্থবারের মত রেজুলেশন গৃহীত হল। গৃহীত হওয়া রেজুলেশনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভোটের অধিকারের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বীকৃতি পেল।

এছাড়া এই রেজুলেশনের মাধ্যমে মিয়ানমারে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা এবং সহিংসতার শিকার নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি জাতিসংঘের বিপুল সংখ্যক সদস্য রাষ্ট্রের শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও অকুণ্ঠ সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বুধবার গৃহীত রেজুলেশনে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের সাময়িক আদেশ, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের তদন্ত শুরুর বিষয় এবং রোহিঙ্গা ও অন্য সংখ্যালঘুদের মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে বঞ্চিত করার মতো নতুন বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের আগষ্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু হয় নিপীড়ন। এই নিপীড়নে কত রোহিঙ্গার প্রাণহানি ঘটেছে কোন হিসাব কারো কাছে নেই। বাস্তুহারা হয়ে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। আশ্রয় ক্যাম্প গুলোতে এখন তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এছাড়া সাগরে ভাসমান নৌকায় হাজারো রোহিঙ্গার ভাগ্যে কি ঘটেছে তা কেউ জানে না। সাগরে রোহিঙ্গাদের ভাসমান নৌকার খবর এখনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশ পেয়ে থাকে।

রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও বিচারাধীন রয়েছে। ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ১৭ বিচারকের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে অন্তবর্তীকালীন নির্দেশনা দেয়া হয় মিয়ানমার সরকারের প্রতি।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রাখাইনে এখন যে রোহিঙ্গারা আছেন, তাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য তখন মিয়ানমারকে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়েছিল নেদারল্যাডন্সের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে)।

মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিল গাম্বিয়া। মামলাটির প্রাথমিক শুনানী শেষে সুনির্দিষ্ট চারটি আদেশে বলা হয়েছিল-

রাখাইনে বসবাসরত সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে। আদালত বলেছে, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোন ধরণের নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা না চালায় কিংবা উস্কানি না দেয় সেজন্য সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, সে সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার কী ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন পরবর্তী চারমাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয়মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে।

মানবাধিকার বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৃধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রেজুলেশন গৃহীত হওয়ায় মামলায় উত্থাপিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়টি আরো বেশি জোড়ালো হয়েছে।

Comment As:

Comment (0)