No icon

ভারতীয় আগ্রাসনের মুখে বাংলাদেশ: অজুহাত হিন্দুদের নিরাপত্তা-এক

চরম মুসলিমবিদ্বেষী উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদী আরএসএস ক্যাডার ও সাবেক মন্ত্রী সুব্রামনিয়াম সোয়ামী হিন্দুদের ওপর কথিত অত্যাচার বন্ধের অজুহাতে সামরিক অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশ দখল করার ধমক দিয়েছেন। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)’এর বিরুদ্ধে অহেতুক কুমন্তব্য করার প্রতিক্রিয়ায় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কোরবানপুর গ্রামে জনৈক শঙ্কর দেবনাথ এবং তার প্রতিবেশীর বাড়ির পাঁচটি ঘর ও একটি মন্দির ভাঙ্গচুর করে ও আগুল লাগায়। হামলার জবাবে পাঁচশতাধিক অজ্ঞাত মুসলমানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণ, এমনকি মিডিয়াও নিশ্চিত করেছেন যে, শঙ্কর দেবনাথ ফেসবুকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমম্যানুয়েল ম্যাক্রনের (ঊসসধহঁবষ গধপৎড়হ) মানহানিকর ইসলামবিরোধী মন্তব্য সমর্থন করেছিলেন, যা হযরত মোহাম্মদকে (সাঃ) সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্যও জুড়ে দেয়। সুতরাং ওই হিন্দু ঘটনার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী।

(https://www.dhakatribune.com/bangladesh/nation/2020/11/02/500-sued-5-jailed-over-attack-on-hindu-homes-in-comilla)

আরএসএস নেতা সোয়ামী শঙ্কর দেবনাথের কারণেই যে মুরাদনগরের ঘটনা ঘটেছে তা একবারও ভাবে নি। আর এই হামলা যে কোনভাবেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর্যয়ে পড়ে না তা-ও তিনি এড়িয়ে গেছেন। অথচ কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী সুব্রামনিয়াম এবং তার সহযোগীরা বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে এবং বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ বিরোধী জনমত তৈরির জন্য তথাকথিত ‘গ্লোবাল বাঙালী হিন্দু কোয়ালিশন’এর ব্যানারে ভারত ও বিশ্বের বেশ ক’টি দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং হাই কমিশনের বাইরেও ব্যাপক বিক্ষোভ করে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনের বাইরেও প্রতিবাদ করেছিল। (Https://www.sindhuvox.in/politics/government-to-send-troops-to-banglashad/)

দুটি বাড়ির পাঁচটি ঘর ও একটি মন্দির ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের অজুহাতে হিন্দুদের ওপর কথিত অত্যাচার বন্ধে বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে এই দেশ যদি দখল সংগত হয়ে থাকে তা’হলে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সন হতে আজ পর্যন্ত কতো হাজার হাজার দাঙ্গায় লাখ লাখ খুনের অপরাধে ভারতের অস্তিত্ব তো বহু আগেই বিলীন হওয়া উচিত ছিল। রাষ্ট্র হিসেবে চরম শাস্তি ভারত কীভাবে এড়াবে?
সুব্রামনিয়াম সোয়ামীসহ ভারতীয় এমন কোন বুদ্ধিজীবী কিংবা ঐতিহাসিক বলতে পারবেন না ১৯৪৭ সনের পর থেকে ২০২০ সন পর্যন্ত ভারতে মুসলিমবিরোধী কতোহাজার দাঙ্গা হয়েছে এবং ওইসব দাঙ্গায় কতো লাখ মুসলিম শহীদ ও পঙ্গু হয়েছেন। কতো লাখ মা-বোন ধর্ষিত, বিধবা হয়েছেন? কতো শিশু পিতামাতা হারিয়ে পথের ফকিরে পরিণত হয়েছে?। কতো লাখ দোকান-পাট, বসতবাড়ি লুটপাট হয়েছে কিংবা আগুনে পুড়েছে? ভারতীয় হিন্দুদের কী মানবতাবিরোধী এসব নৃশংস হত্যাকান্ডের লুটপাটের অপরাধের শাস্তি হতে রেহাই দেয়া উচিত হবে? একদিন এ সবের জন্য অবশ্যই তাদেরকে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়াতে হবে।
ভারতীয় মুসলিম-বিদ্বেষ কেমন চড়া তার কিছু নমুনা দিচ্ছি । পশ্চিম বাংলার মুসলিম প্রধান জেলা মুর্শিদাবাদ। জেলা শহরে বহরমপুরে মুসলমানরা জমি ও ফ্ল্যাট কিনতে কিংবা ঘর-ভাড়া দোকানভাড়া নিতে পারছেন না। ‘নতুন গতি’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা (১৬ নভেম্বর, ২০২০) জানায় বহরমপুর শহরের জজকোর্টের নিকটবর্তী ঘোষ লেনে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনে ছয়জন উচ্চশিক্ষিত মুসলিম ফ্ল্যাট কেনার জন্য মোট দামের ১০ শতাংশ অগ্রিম দিয়ে বায়না চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু স্থানীয় হিন্দুরা ওই এলাকায় মুসলমানদের কাছে কোন ফ্ল্যাট বিক্রি করা যাবে না এমন সিদ্ধান্তের কথা নির্মাণাধীন ভবনের মালিককে জানিয়ে হুমকি দেয় হয় যে, তাদের নির্দেশের বাইরে গেলে ভবনটিও ভেঙ্গে ফেলা হবে। মালিক ছয়জন মুসলিমের বায়নার টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। মুসলমানদের সহযোগিতায় সেখানে কোন হিন্দু এগিয়ে আসে নি (https://www.natungati.in/in-the-city-of-bahrampur-muslims-do-not-have-the-opportunity-to-rent-a-house-or-buy-a-flat-complaints-are-rising/) ।

মোদির রামরাজ্যে মুসলমানরা কতো ধরনের অপমান ও নির্যাতনের শিকার হন তার উদাহরণ পশ্চিম বাংলার মালদাহ জেলার ১৮ জন মাদ্রাসা শিক্ষক। তারা তাদের সম্মেলন উপলক্ষে কলিকাতার সল্টলেকের ডি এল ৩৭ ট্রিনিটি গ্রেস্ট হাউসে অগ্রিম বুকিং দিয়েছেন। নির্দিষ্ট দিনে ২০ সেপ্টেম্বর তারা ওই হোটেলের তিনটি রুমে ঢুকেন। সকালের নাস্তা করার জন্য বাইরে গিয়ে রুমে আসলে হোটেলের ম্যানেজার তাদেরকে ওই রুমগুলোতে রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাদেরকে ওই গেস্টহাউজ ছেড়ে দিতে বলেন । এ ব্যাপারে ম্যানেজারের ব্যাখ্যা হলো: মুসলিমরা নাস্তার খাবার জন্য হোটেলে যাবার সময় আশেপাশের হিন্দু প্রতিবেশীরা দেখেছে । প্রতিবেশীরা তাদের এলাকায় মুসলমানদেরকে নিরাপদ মনে করেন না। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে তাদেরকে হোটেল ছাড়তে হয়েছে। এমন অপমান ও অপাংক্তেয়তা তথা অত্যাচার ও নির্যাতনের ভার এবং মানসিক যন্ত্রণা কী বাংলাদেশে হিন্দুদের পাঁচটি ঘর ও একটি মুর্তি ভাঙার চেয়েও কম ?

এমন ঘটনা কেবল বহরমপুরে নয় কিংবা কলিকাতায় নয় ভারতের সর্বত্র বিরাজমান। এই ধরনের ঘটনার কোন বিচার হয় না সুব্রামনিয়ামদের ভারতে। মোদি-সোয়ামীদের কাছে এসব তো অতি তুচ্ছ ঘটনা। তাদের কাছে তো মুসলমানরো গরুর চেয়েও অধম। মুসলিম শ্রমিকের হাতে ‘আল্লাহু’ লেখা থাকার জন্য হাত কেটে ফেলা হয়। ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হয়। ‘শ্রীরাম’ না বললে খুন করা হয়। সারা ভারতব্যাপী এর চেয়ে কতো বেশী মুসলিমবিরোধী ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে তার সামান্যই ভারতের সংবাদ মাধ্যমে আসে। অথচ এরপরে মানবতাবিরোধী ভারত নাকি ধর্মনিরপেক্ষে। দুনিয়ার কথিত বৃহত্তম গণতন্ত্র। যে দেশে মুখে দাড়ি রাখার কারণে মুসলমানদের চাকরি হতে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, বহু রাজ্যে মুসলমানদের ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানি নিষিদ্ধ করা হয়, গরুর গোশত রাখার কিংবা বহন করার সন্দেহে জীবন দিতে সেই দেশের সুব্রামনিয়াম সোয়ামী পাঁচটি ঘর এবং একটি মন্দির ভাঙ্চুর করার কারণে একটি স্বাধীন দেশ দখল করার ঘোষণা দেন কোন লজ্জায়? সোয়ামীর দেশের মানবতাবাধিকার কর্মী, বিবেকবান সাংবাবাদিক,

বুদ্ধিজীবী কোণঠাসা কিংবা কারারুদ্ধ। আর ১৯৪৭ সন থেকে ২০২০ সন পর্যন্ত ভারতে মুসলিমবিরোধী কতো দাঙ্গা হয়েছে কতো মুসলিম খুন-জখমের শিকার হয়েছেন, কতো মহিলা ধর্ষিত ও নির্যাতিত হয়েছেন, কতো মুসলিম শিশু মা-বাবা হারিয়েছেন, মুসলানদের কতো ঘরবাড়ি, দোকান-পাট পোড়ানো অথবা লুট হয়েছে কিংবা মসজিদ, মাদ্রাসা, মুসলিম কবরস্থান হিন্দুদের দখলে চলে গেছে সেই তথ্য ভারত সরকারও প্রকাশ করবে না। এমনকি অনলাইনে ১০ বছর আগে যে সামান্য তথ্য পাওয়া যেতো, তাও এখন নেই। যেসব ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এসেছে সেগুলোর কিয়দাংশ পাওয়া যেতে পারে।

এখানে ১৯৭০ থেকে ২০২০ সনের মধ্যে ঘটে যাওয়া মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার সামান্য তথ্য তুলে ধরছি। আসাম (১৯৮৩) সরকারীভাবে স্বীকৃত ২,১৯১, কিন্তু বেসরকারী হিসেব হলো ১০ হাজারের বেশি। গুজরাটে (বছরের উল্লেখ নেই) ৩,১৩০; (১৯৬৯ ও ১৯৭০ সনে) যথাক্রমে ৬৩০ ও ২,৫৫০; (২০০২ সনে) দুই হাজারের বেশি; মহারাষ্ট্র (১৯৯২ সনে) ২,০০০; ভাগলপুর (১৯৮৯) ১,০০০ নিহত, গৃহচ্যুত ৫০,০০০; বোম্বাই (১৯৯২ সনে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর) সরকারীভাবে স্বীকৃত মৃত ৯০০। ভারতে মুসলিম হত্যা যেন উৎসব হিসেবে উদযাপন করাা হয়। (আরো জানার জন্য নিচের লিংকগুলো দেখুনঃ

(https://time.com/5794354/delhi-riots-muslims-india/)                                                                                                                                                                                                                                                (Https://www.sciencespo.fr/mass-violence-war-massacre-resistance/fr/docament/hindu-muslim-communical-riots-india-i-1947-1986.htm)

ওপরের তথ্যগুলো মুসলিম খুনের প্রকৃত হিসাব প্রতিনিধিত্ব করে না। এগুলো সর্বভারতীয় তথ্যও নয়। তথ্যের ভারে সোমায়ীরা লজ্জিত নন। মুসলিম-বিদ্বেষ তাদের মানবিকতা ও মগজ এতোই কলুষিত যে লজ্জা কিংবা অনুশোচনা নামক মানবিক গুণাবলী তাদের মন থেকে উবে গেছে। এই কারণেই তারা বাংলাভাষী মুসলিম ভারতীয় নাগরিকদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে আইন পাশ করিয়েছে। এটা হলো তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক ভারতের চেহারা। নরেন্দ্র মোদির মতো নির্মম খুনি যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, সেদেশের রন্দ্রে রন্দ্রে খুনি থাকা অতি স্বাভাবিক। এই ক্ষেত্রে আরএসএস, কংগ্রেস, কমিউনিস্ট সবাই এক ও অভিন্ন প্রকৃতির। কংগ্রেস আমলে ভারতে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও সর্বাধিক মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা হয়েছে। কমিউনিস্ট আমলে পশ্চিম বংগে মুসলিমরা সর্বাধিক ঠকেছে। আর মোদিযুগে সাম্প্রদায়িকতা ভারতের ঘরে ঘরে রাস্তায় রাস্তায় এমনকি আদালতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোথাও মুসলমানরা নিরাপদ নন। তারা যেকোন জায়গায় যেকোন সময় খুনের, লুটের, লাথি-ধাক্কার, ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। ভারত এখন যেন সরকারীভাবে অনুমোদিত গণ-সাম্প্রদায়িকতার দেশ, যেখানে মুসলিম হত্যার জন্য কোন শাস্তি হয় না।

Comment As:

Comment (0)