No icon

শহীদ জিয়ার খেতাব ও রাজনৈতিক নীচুতা

শেক্সপিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব-মহত্ত্বকে এভাবে দেখেছেন : 'Some are born great, some achieve greatness, and some have greatness thrust upon'. শহীদ জিয়ার নেতৃত্ব-মহত্ত্ব জন্ম থেকে প্রাপ্ত নয়। এটি আরোপিতও নয়। এটি অর্জিত। নিজ কর্মধারা দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা, শ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহস এবং দেশপ্রেম দ্বারা তিনি এটি অর্জন করেছেন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে রক্ত সাগরে অবগাহন করেছেন তিনি। অবশেষে দেশ, জাতি, রাষ্ট্রের নায়ক ও ধারকদের সতত স্বীকৃতির স্মারক পেয়েছেন তিনি। এটি কারো দয়া বা অনুগ্রহের প্রাপ্তি নয়। একটি মুক্তিযুদ্ধে ঢেলে দেয়া ত্যাগ-তিতিক্ষা ও শ্রম সাধনার ফসল।

 

অনেকেই যুদ্ধ করেছেন। সাধারণ সৈনিক থেকে সেনাপতি পর্যন্ত। কেউ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেছেন। তারা জাতির ‘বীরশ্রেষ্ঠ’। আবার উত্তম নেতৃত্বের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে জয়ের প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন, তারা বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। এভাবে প্রাপ্ত হয়েছেন বীর বিক্রম এবং বীর প্রতীক ইত্যাদি খেতাব। বীর উত্তম খেতাবটি বেঁচে থাকা যুদ্ধনায়কদের শ্রেষ্ঠ খেতাব। তিনি যে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন এবং যুদ্ধ কৌশলের অন্যতম প্রণেতা ছিলেন- তা প্রমাণ দিয়ে তথ্য দিয়ে প্রমাণ্য বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে তার নাম লেখা আছে। আর তিনিই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সেনাবাহিনীর অনুঘটক। তিনটি কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের অবদান অনন্য।

প্রথমত, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সামনে রেখেই এগিয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয়ত, তিনিই প্রথম পাকিস্তানি সামরিক পদাধিকারী কর্মকর্তা যিনি প্রথম বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘উই রিভোল্ট’। তৃতীয়ত, একটি সংগঠিত সেনাদল নিয়ে তিনিই প্রথম ভারতে প্রবেশ করেন। পরে সেই আদলে বিদ্রোহী সেনাদের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী সংগঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে তার বীরত্বের প্রশংসা করেন। ভারতের প্রেসিডেন্ট সঞ্জিব রেড্ডি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার অনন্য সাধারণ ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে রাজনৈতিক মতলববাজরা এখন আবিষ্কার করছেন যে, জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএস-এর এজেন্ট ছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে তারা কটুকাটব্য করছেন ও অসত্য, অশালীন বক্তব্য প্রচার করছেন। তাদের সর্বশেষ রাজনৈতিক নীচতার প্রমাণ ‘বীর উত্তম’ খেতাব কেড়ে নেয়ার প্রস্তাবনা।

এই প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছেন এমন এক ব্যক্তি যিনি ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অংশীদার। জাসদের গণবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা ছিল তার। সে দিন দেখলাম এক টকশোতে তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে ভুলের স্বীকৃতি দিচ্ছিলেন। আসলে এরা হচ্ছে নীতিহীন ক্ষমতাপাগল একদল মানুষ। যারা ক্ষমতার জন্য না পারে এমন কিছু নেই। সাম্প্রতিককালে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদচ্যুত হয়েছেন। মন্ত্রিত্ব থাকাকালীন অবস্থায় পরিবহন শ্রমিকদের নেতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ। অনেকেই মনে করেন, একধরনের নেতিবাচক কাজ করে তিনি নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। কথাই তো আছে- ‘রাজা যা বলে পারিষদ বলে তার শতগুণ’। আজকাল ‘ডিজঅর্ডার বিকামস অর্ডার অব দ্য ডে’ অন্যায়, অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খলা-বিশৃঙ্খলা নেতৃত্বের গুণাবলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে নেতারা ত্যাগ-তিতিক্ষা, শ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে নেতানেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চোখের সামনে দেখেছি- বেয়াদব জুনিয়র কর্তৃক আদব সিনিয়রকে মার খেতে। যে যত বেপরোয়া হতে পারে ততই তার শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি ঘটে। বলা বাহুল্য, এই নেতাও সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের মাধ্যমে শীর্ষদেশে পৌঁছেছেন। রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিতরা এভাবেই কৌশল করে কুশলতা অর্জন করতে চায়। শোনা যায়, বিএনপি আমলে ঘাতকদালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল সরকারদলীয় এরকম ক্ষমতাপাগল লোকদের দ্বারা। অবশ্য সংগঠনটি আওয়ামী লীগ দ্বারা হাইজ্যাক হয়ে যায়। যা হোক সে দিন টকশোতে উপস্থাপক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন : এটা আলজাজিরার ঘটনা থেকে জনগণের চোখ অন্য দিকে ফেরাবার কৌশল কিনা? জিয়াউর রহমান সম্পর্কে ক্ষমতাসীন লীগের অভিযোগের শেষ নেই। ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনাবলির সাথে তাকে সংশ্লিষ্ট করে ইদানীং কথা বলছেন নেতানেত্রীরা। ১৫ আগস্ট নিয়ে এই সরকার তদন্ত করেছে। যারা ১৫ আগস্ট ঘটনার কুশীলব ছিল তারা কেউ বলেননি যে, জিয়াউর রহমান কোনোভাবেই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

৩ নভেম্বর সেনা অভ্যুত্থানের মূল নায়ক কর্নেল শাফায়াত জামিল ১৯৮৮ সালে আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, জিয়া আগস্ট হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। পরবর্তীকালে তার সাক্ষাৎকার এবং প্রকাশিত দু’টি গ্রন্থে তিনি সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। অথচ আওয়ামী লীগের লোকেরা কারো কারো দুর্বল পরোক্ষ উদ্ধৃতি ব্যবহার করে মিথ্যাচার করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে যথার্থ উদ্ধৃতিটি এরকম ‘সুজনে সুজশ গায়-কুজশ নাশিয়া, কুজনে কুজশ গায় সুজশ ঢাকিয়া’। আগস্ট হত্যাকারীদের বিচার করা হয়েছে। ফাঁসি দেয়া হয়েছে তখন তাদের এটি খেয়াল ছিল না। এখন তাদের খেয়াল এই কারণে যে, অবশেষে জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার এবং তার সৃষ্ট রাজনৈতিক দল তাদের ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ। বিগত ১২ বছর ধরে এই দলটির প্রতি তাদের অন্যায়-অত্যাচার চলছে। এই দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী হত্যা, গুম, হামলা, মামলার শিকার হয়েছে। এরপরও তৃণমূলে গরিষ্ঠ জনগণ বিএনপিকে সমর্থন করে। এই সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও জাতীয় পর্যায়ের কারসাজি ও শক্তি প্রয়োগ করে তাদের জিততে হচ্ছে। নিত্যদিন ওবায়দুল কাদের বলেন : বিএনপি নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং তিনিই আবার প্রতিদিনই বিএনপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। তাহলে তারা যে নিঃশেষ হয়ে যায়নি তিনিই তা প্রমাণ করছেন।

ক্ষমতাসীন দলের এই প্রবণতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নীচতাকেই প্রমাণ করে। বিজ্ঞজনরা অনেক গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নিম্নস্তরের বলেছেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ভিলেজ পলিটিক্স স্টাইলে তারা এমন সব কথাবার্তা বলেন যা তাদের রাজনৈতিক অপরিক্বতা ও অসারতাই প্রমাণ করে। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র তার ইতিহাসের ৫০ বছর অতিক্রম করতে যাচ্ছে। এই অবস্থায়ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি রচিত হয়নি। ক্ষমতাসীনরা মনে করেন যে, জোর করে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার মানেই হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আসলে সমাজে ভেতরে ভেতরে এর মাধ্যমে যে ক্ষোভ দুঃখ-কষ্ট সঞ্চিত তা একসময় বিস্ফোরণ ঘটায়। আমরা কেউই বিস্ফোরণ দেখতে চাই না। সে জন্যই স্বাভাবিক নির্বাচন ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চাই। গায়ের জোরে যে ইতিহাস পাল্টানো যায় না তা বুঝতে এরা অক্ষম।

জিয়াউর রহমান দোষে-গুণে মানুষ ছিলেন। তার অর্জন যেমন রয়েছে হয়তো ব্যর্থতাও রয়েছে। মানুষ মৃতের সাথে লড়াই করে না। অথচ এরা তা করছে। তবে আদর্শের সমালোচনা বহমান। জিয়াউর রহমানের আদর্শ এ জাতি গ্রহণ করেছে কি করেনি তার দলের বারবার নির্বাচিত হওয়া থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আজো যদি কেউ জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করতে চায় তা করতেই পারে। কিন্তু যেটি সর্বজন স্বীকৃত সত্য, যেটি ইতিহাস হিসেবে সর্বত্র স্বীকৃত সেটি চ্যালেঞ্জ করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে প্রকারান্তরে তারা যে মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন বা মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করছেন সেটি তাদের বোধগম্য নয়। এই সমাজে বিবেকবান মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সে দিন সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন। আজ আর নেই। গত সপ্তাহে তিনি লিখেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ভূমিকা রেখেছেন। সশস্ত্র যুদ্ধে কার কী অবদান সে প্রশ্নের মীমাংসা প্রবাসী সরকারের নেতাদের সাথে আলোচনা করে বঙ্গবন্ধুর সরকারই ১৯৭৩ এ করে গেছে। তার ওপর কলম চালানো, তাকে চ্যালেঞ্জ করা অতি অশোভন।’

এটি একটি অপ্রিয় সত্য যে, এ ধরনের প্রবণতার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকার দেশকে ভাগ করতে চায়। স্বাধীনতার প্রাথমিক বছরগুলোতে তারা মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা সেনাবাহিনী চিহ্নিত করে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। যার কারণে দু’জন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতিকে তাদের হাতে প্রাণ দিতে হয়। আমলাতন্ত্রকে মুজিবনগরীয় ও অমুজিবনগরীয়ভাবে বিভক্ত করে। সে দিনও তারা জনগণকে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ হিসেবে বিভাজিত করে। আজো তাদের সে চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে একটি জাতিকে তেতিয়ে ক্ষেপিয়ে আপাত ক্ষমতার মালিক হওয়া যায়। কিন্তু অবশেষে জাতীয় ঐক্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। জাতীয় মৌলিক নীতিগুলোকে তারা এমনভাবে বিন্যস্ত করছে যে, জাতীয় আদর্শের প্রতিনিধিত্বশীল একটি জাতি সংহত হয়ে গড়ে উঠছে না।

সেভাবে জাতির গণতান্ত্রিক মন-মানস ও প্রতিষ্ঠানকে তারা এমনভাবে বিপর্যস্ত করেছে যে অদূরভবিষ্যতে এর মেরামত দুরূহ বিবেচিত হবে। অথচ যে জিয়াউর রহমানকে তারা অপাঙ্ক্তেয় করে তুলতে চায়, মুছে দিতে চায় যার অবদান তিনিই শেখ হাসিনাকে দেশে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের আওতায় বাকশাল ঝেড়ে আওয়ামী লীগ বৈধতা পেয়েছিল। বাকশালের মাধ্যমে বিসর্জিত গণতন্ত্র জিয়াউর রহমানই পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। সামরিক শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমানের শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতীয় ঐক্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন উদ্দীপনার জন্য জাতি চিরকাল তাকে স্মরণ করবে।

গত ১২ বছর ধরে গণতন্ত্রের লেবাসে জিয়াউর রহমানের সেই অর্জনগুলো পরিত্যজ্য হয়েছে। মানুষ গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। নির্বাচনের মতো সতত স্বাভাবিক বিষয়কে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। একটি অংশ আত্মসমর্পণ করে আত্মপ্রসাদ লাভ করছে। অপর অংশ রাগ-দুঃখ-ক্ষোভে দুমড়ে মরছে। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না। ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!’

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ

Comment As:

Comment (0)