No icon

গাজায় ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করেছে, জাতিসংঘ কিছুই করেনি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইল ১১ দিনের যুদ্ধে যে জেনোসাইডাল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল তা রিয়াল টাইমে আমরা দেখতে পেলাম। ইসরাইল গাজায় যুদ্ধাপরাধ করেছে।

বিশিষ্ট এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বলেছেন, জাতিসংঘ হচ্ছে হোয়াইট এলিফেন্ট। তাদের কোনো ভূমিকা নেই গাজা যুদ্ধে, কোনো যুদ্ধে নেই। যদি থাকত তাহলে ত্রিশ বছর ধরে ভিয়েতনামে এবং বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে যুদ্ধ হত না। তিনি বলেন, হলোকাস্টের জন্য দায়ী সাদা ইউরোপীয়রা।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: মিশরের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে।  কিন্তু গত ১১ দিন কিংবা ১২ দিনের যুদ্ধে নারী-শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষ মারা গেছে নির্মমভাবে, আহত হাজার হাজার, বাড়িঘর ধ্বংস-তো ইসরাইলের ঐ বর্বর হামলাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক ইমতিয়াজ: দেখুন, আমি কয়েকিট বিষয়ের কথা বলব। একটা হলো বর্তমানে যে প্রযুক্তিগত দিক আছে তাতে ইসরাইল, ফিলিস্তিনের গাজাতে যেভাবে হামলা চালিয়েছে, তারা যে কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এরপর হামাস যে রকেট  ব্যবহার করেছে তাও দেখা গেছে। আমরা দেখলাম ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইল কিভাবে এয়ার স্ট্রাইকের মাধ্যমে একটা জেনোসাইডাল পরিস্থিতি তৈরি করল!  তাদের সেই হামলায় দু’শর উপরে ফিলিস্তিনি মারা গেল। হিসেবে হয়তো দেখা যাচ্ছে ১০ জন ইসরাইলি মারা গেছে। আগে এ ধরনের রিয়াল টাইমে এসব দেখতে পেত না। বর্তমানে রিয়াল টাইমে আমরা তা দেখেতে পেলাম। বিশেষ করে গণমাধ্যমের করপোরেট ইন্টারেস্ট থাকে। তাতে তারা আগে নিজেদের মত করে সাজিয়ে জিনিষ দেখাত। সেটা আর এবার সম্ভব হয়নি। যারজন্য এবার গাজায় ইসরাইলি হামলার ফলে বিশ্বে একটা বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছে। যদিও যুদ্ধ বিরতি হয়েছে কিন্তু মনে রাখতে হবে এর সমাধানের কথা বলতে গেলে ইসরাইলি জনগণের মধ্যে আমরা এবার দেখলাম একটা অংশ ফিলিস্তিনের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকি ইসরাইলের বাইরে যে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ আছে তারা বড় আকারে গাজা হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তো সেই জায়গায় একটা পরিবর্তন আমরা এবার দেখতে পেলাম। আরও দুটো জায়গায় সমাধানের একটা সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। সেটা হলো আমেরিকার ভেতরে আমেরিকার জনগণের মধ্যে একটা বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া যেমনটি এবার দেখেছি আরেকটি হচ্ছে ইউরোপের মধ্যে। কারণ মনে রাখতে হবে সমস্যাটি কিন্তু ইউরোপের। ইউরোপীয়ানরা ইহুদিদের সাথে থাকতে পারেনা। যে হলোকাস্টের কথা বলা হয়-যেখানে ছয় মিলিয়ন ইহুদি হত্যার কথা বলা হয় সেটা ইউরোপীয়রা করেছে। সেটা সাদা ইউরোপীয়রা করেছে, সেটা মূলত খৃষ্টানরা করেছে। সেই বিষয়টি কিন্তু আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। সেই জায়গায় আমাদের অ্যাটেনশানটা ফেলতে হবে। কারণ সেই ইহুদিনিধন ঘটিয়েছিল ইউরোপের সাদা খৃষ্টানরা। তাদেরকে আরবরাও মারেনি মুসলিমরাও মারেনি আর ফিলিস্তিনিরা তো মারেইনি।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ- আপনি বললেন-আমেরিকা, ইউরোপ, আরব দেশগুলো এমনকি ইসরাইলের মধ্যেও মানুষের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। তারা ফিলিস্তিনের পক্ষে। আপনি এও বললেন, আসলে হলোকাস্টের জন্য ইউরোপীয়রাই দায়ী।  তো যাইহোক আজকের প্রেক্ষাপটে খোদ মার্কিন প্রশাসন, ইউরোপের দেশগুলো যারা মানবাধিকারের কথা বলে- তারা কিন্তু এই যুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছে- এ বিষয়টি সম্পর্কে কি বলবেন আপনি?

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ: আমি সেকথাই বলছিলাম। যে আমেরিকা আগে পুরোপুরি বলতে গেলে ইসরাইলের পক্ষেই কাজ করত। কিন্তু এবার দেখা গেল আমেরিকার জনগণের একটা বড় অংশ ফিলিস্তিনের পক্ষে  সোচ্চার হয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক দলের মধ্যে একটা বড় অংশ সোচ্চার হয়েছে। ফলে জো বাইডেনও একটা চাপের মধ্যে পড়েছে এবং তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে বারবার ফোনে কথা বলেছেন। ফলে এখানে মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনগণের কিন্তু এখানে একটা বড় দায়িত্ব আছে। তারা যদি সরকারের উপর বড় আকারের প্রেসার না আনতে পারে তাহলে কিন্তু সরকারে যেই থাকুক না কেন এখন যেভাবে যা করে যাচ্ছে সেভাবেই তারা করতে থাকবে। আরেকটি ক্ষেত্র হলো ইউরোপ। আমরা এবার ইউরোপেও দেখেছি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পষ্টভাবে বলেছে, গাজায় ইসরাইলি হামলা যুদ্ধ অপরাধ( ওয়ার ক্রাইম) হচ্ছে। একাধিক  মানবাধিকার সংগঠন গাজায় ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে কথা বলেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকি যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টি আগের চেয়েও অনেক বড় আকারে প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইসরাইলি সৈন্যরা এবং বিমান হামলার মাধ্যমে তারা যা করল গাজায়, রিয়াল টাইমে এবার যা দেখা গেল এর আগে এমনটি না থাকায় কিন্তু একটু রাখঢাক করে এক ধরনের রাজনীতি তৈরি করতে পারছিল আমেরিকা এবং ইউরোপ।

রেডিও তেহরান:  জ্বি, অধ্যাপক ড ইমতিয়াজ আহমেদ, গাজার সাম্প্রতিক ঘটনায় জাতিসংঘের তেমন কোনো ভূমিকা দেখা গেল না, একটা বৈঠক হয়েছিল কিন্তু সেখানে কিছুই হয়নি। জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে কি বলবেন?

অধ্যাপক ইমতিয়াজ: দেখুন, জাতিসংঘের কোনো ভূমিকাই নেই। কোনো যুদ্ধে যদি জাতিসংঘের ভূমিকা থাকত তাহলে ত্রিশ বছর ধরে ভিয়েতনামে যুদ্ধ হতো না। জাতিসংঘের যদি কোনো ভূমিকা থাকত তাহলে বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে যুদ্ধ হতো না। জাতিসংঘ হচ্ছে একটি হোয়াইট এলিফেন্ট। একে কেন পোষা হচ্ছে আমার কাছে সেটা বোধগম্য হয় না। জাতিসংঘে স্থায়ী সদস্য দেশ পাঁচটি। তারা বড় বড় শক্তি। তারা যখন কোনো একটা বিষয়ে একমত হবেন তখন সেটি হবে। অন্যথায় হবে না। কিন্তু কখনও তারা এক হয় না। সেদিক থেকে জাতিসংঘের এখানে কিছু করার আছে বলে আমার মনে হয়না। এমনকি বর্তমান প্যানেডেমিক করোনার সময়ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডাব্লিউএইচও'র ভূমিকা বড় আকারে তেমন কিছু দেখতে পাইনি। সেই জায়গায় আমার মনে হয় না ফিলিস্তিন ইস্যুতে জাতিসংঘ সমাধান টানবে। আপাতত সে আশাটাকে বাদ দেয়া ভালো। আমি মনে করি তিনটা জায়গা থেকে সমাধান আসতে পারে- ইসরাইলের জনগণ, আমেরিকার জনগণ এবং ইউরোপের জনগণ- এই তিন জনগণের একটা বড় দায়িত্ব আছে এই সমাধানের বিষয়ে।

রেডিও তেহরান: তো জনাব অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ- গাজা যুদ্ধ, সর্বসম্প্রতি যুদ্ধবিরতি, হত্যা- ধ্বংস এবং বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্য আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

Comment As:

Comment (0)