No icon

যদি অসুস্থ না হতাম, তা হলে আমি দেশে গিয়ে জেল খাটতাম : ফখরুলকে খোকা

ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।সাদেক হোসেন খোকা তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির রাজনীতিতে বিরাজ করছে বিশাল শূন্যতা। একই সঙ্গে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে পুরান ঢাকায় দলটির রাজনীতি। ডান ও বামদের সমন্বয় ঘটিয়ে উদার মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করতেন খোকা
গুরুতর অসুস্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। তিনি এখন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের গ্যারিলা যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর দুর্নীতি মামলায় তার সাজা হয়। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়। এরপরও বারবার দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন খোকা। কিন্তু শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে দেশে ফেরেননি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও একাধিকবার তিনি দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। পর কিছুদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান টুকুর সঙ্গে ফোন করে দেশে আসার আকুতির কথা জানিয়েছেন।

সেটি স্মরণ করে রোববার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে খোকার জন্য দোয়া মাহফিলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ’আজকে যখন আমরা স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করছি, তখন সাদেক হোসেন খোকাকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে দেশের বাইরে রাখা হয়েছে। তিনি ক্যান্সার রোগে ভুগছেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। আমি কয়েকবার তার সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা করেছি। প্রতিবারই তিনি আমাকে বলেছেন- যদি অসুস্থ না হতাম, তা হলে আমি দেশে গিয়ে জেলে যেতাম, মানুষের সঙ্গে থাকতাম।’

তিনি বলেন, সাদেক হোসেন খোকা আমাদের ও তার বন্ধুদের বলেছেন যে, ’দেশের মাটিতেই যেন আমার কবর হয়’।

মির্জা ফখরুল বলেন, রোববার সকালে সাদেক হোসেন খোকার ছেলে আমাকে ফোন করে বলেছেন, তার বাবার ইচ্ছাটা সে পূরণ করতে চায়। তিনি যেন দেশে ফিরতে পারেন তার উদ্যোগ নিতে আমরা সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ’আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাতে চাই, তিনি যেন সুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি।’

খোকার সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ’আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সাদেক হোসেন খোকাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিয়ে আমাদের কাছে পাঠান। দোয়া করি আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্য, যাকে কেন্দ্র করে আমাদের রাজনীতি গড়ে তুলেছি। তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, স্বৈরাচার থেকে দেশকে মুক্ত করেছেন। তিনি যেন সুস্থ ও মুক্ত হয়ে আমাদের নেতৃত্ব দিতে পারেন।’

খোকা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ’যে মানুষ ঢাকা মহানগর শুধু নয়, সারাদেশে যারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তাদের প্রিয় মানুষ। যিনি আমাদের ঢাকা মহানগরের সব নেতাকর্মীর কাছে সত্যিকার অর্থে একজন দরদি মানুষ। এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যে তাদের প্রয়োজনে তিনি এগিয়ে আসেননি।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ’আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের যাঁতাকলে পড়ে শুধু সাদেক হোসেন খোকা নন, আমাদের অনেক মানুষ এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং অনেকেই এখন শেষ পর্যায় চলে এসেছেন। আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও শাজাহান সিরাজ সাহেব অত্যন্ত অসুস্থ। আমাদের যারা বয়স্ক মানুষ আছেন, তারা এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন দেশের এই অবস্থার কারণে।’

এদিকে হাসপাতালে যাওয়ার আগে সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আক্ষেপ করে বলেছেন, জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। দেশের মাটিতে বিদায় হবে কিনা আল্লাহ জানেন। আমার জন্য দোয়া করো।

সাদেক হোসেন খোকার অবস্থা সংকটাপন্ন শুনে ভেঙে পড়েছেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তার সুস্থতা কামনায় একটি আবেগঘন খোলা চিঠি লিখেছেন। সেটি নিজের ফেসবুক ওয়ালে দিয়েছেন মির্জা আব্বাস। এই চিঠি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে বিএনপির নিযুত নেতাকর্মীদের। খোলা চিঠিতে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, সুস্থ হয়ে ফিরে এসো খোকা, ফিরো এসো। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।

মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ’প্রিয় খোকা, এই মাত্র আমি খবর পেলাম যে, তোমার শরীর খুব খারাপ। তুমি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। জানার পর থেকে আমার মানসিক অবস্থা যে কতটা খারাপ, এই কথাটুকু কারও সঙ্গে শেয়ার করব, সেই মানুষটা পর্যন্ত আমার নেই। তুমি-আমি একসঙ্গে রাজনীতি করেছি, অনেক স্মৃতি আমার চোখের সামনে এই মুহূর্তে ভাসছে।’

স্বার্থান্বেষীরা তাদের মধ্যে বিরোধ জিইয়ে রেখেছে উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ’তোমার আর আমার দীর্ঘ এই পথচলায় কেউ কেউ তাদের ব্যক্তি স্বার্থে তোমার আর আমার মাঝে একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছিল। তবে তুমি আর আমি কেউই সেই দূরত্বে রয়েছি বলে আমি কখনোই মনে করিনি।’

খোকার দু:সময়ে পাশে না থাকতে পারার আক্ষেপ প্রকাশ করে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ’আমি জানি না, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কি না? আমার এই লিখাটি তোমার চোখে পড়বে কি না বা তুমি দেখবে কি না, তাও আমি জানি না। তবে বিশ্বাস কর, তোমার শারীরিক অসুস্থতার কথা জানবার পর থেকেই বুকের ভেতরটা কেন যেন ভেঙে আসছে।’

খোকার সুস্থতার কামনা করে আব্বাস লিখেছেন, ’আমি বার বার অশ্রুসিক্ত হচ্ছি। মহান আল্লাহ তালার কাছে দুহাত তুলে তোমার জন্য এই বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করছি- তিনি অবশ্যই তোমাকে সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরে আনবেন।’

আবার একসঙ্গে পথচলার আশাবাদ ব্যক্ত করে আব্বাস লিখেছেন, ’তুমি আর আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে কাজ করে যাব। না হয় সেই আগের মতোই স্বার্থপর কোনো মানুষদের জন্য আব্বাস আর খোকা বাইরে বাইরে দূরত্বের সেই অভিনয়টা করে যাবে, আর ভেতরে থাকবে দুজনের প্রতি দুজনের অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসা।’

’আল্লাহ তোমার সুস্থতা দান করুক। তুমে ফিরে এসো খোকা, তুমি ফিরে এসো। আমি অপেক্ষায় থাকব’-যোগ করেন আব্বাস।

মির্জা আব্বাস একসময় ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন, পরে সেই স্থানে আসেন খোকা। এরপর আবারও মির্জা আব্বাসকে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়। ঢাকার এক সময়ের মেয়র ছিলেন মির্জা আব্বাস, পরে খোকাও মেয়র হন। মির্জা আব্বাস বিএননি ক্ষমতায় থাকাকালে একাধিকবার মন্ত্রী হন। খোকাও ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিত্ব পান।

মির্জা আব্বাস এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে রয়েছেন। অন্যদিকে ভাইস চেয়ারম্যান খোকা নানা মামলা ও দণ্ড মাথায় নিয়ে কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর আর দেশে ফেরেননি।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন খোকা; এখন তার অবস্থা গুরুতর বলে খবর এসেছে। আর তা শুনেই মির্জা আব্বাসের এই চিঠি।

ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে সপরিবারে নিউইয়র্ক চলে যান সাদেক হোসেন খোকা। তারপর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে একটি বাসায় দীর্ঘদিন ধরে থাকছেন বিএনপির এই নেতা।


উল্লেখ্য,সাদেক হোসেন খোকা ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং তার দল সরকার গঠন করলে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালে তার দল সরকার গঠন করলে তিনি মৎস ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি সরাসরি নির্বাচনে জয় লাভের মাধ্যমে ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

Comment As:

Comment (0)