No icon

ফেলানী হত্যার নয় বছর! এখনও বিচারের আশায় বাবা-মা

পুর্ন হতে যাচ্ছে সীমান্তে ফেলানী হত্যার নয় বছর। মেয়ের হত্যাকারীর কাঙ্খিত বিচার পায়নি পরিবার। ফলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বাবা নুরল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর অনন্তপুর সীমান্তে ৯৪৭ নং আন্তর্জাতিক ৩ নং সাব পিলারের পাশ দিয়ে মই বেয়ে কাটাতার ডিঙ্গিয়ে বাবার সঙ্গে দেশে ফিরছিল ফেলানী। এ সময় টহলরত চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ তাকে গুলি করে হত্যা করে। ফেলানীর বাড়ি উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামে।

আগামী কাল ৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার পারিবারিকভাবে পালন করা হবে ফেলানীর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। আয়োজন করা হয়েছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। ৬ জানুয়ারি এ বিষয়ে বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মানবাধিকার সংস্থাসহ বহু জনের কাছে গিয়েছি কিন্তু ৯ বছরেও কাঙ্খিত বিচার পেলাম না।’

এদিকে গত কয়েক বছরের মতো এবারও ঢাকায় ২দিনের কর্মসূচী পালন করছে নাগরিক পরিষদ। গুলশান ২ এ অবস্থিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পার্ক রোড অথবা কুটনৈতিক এলাকায় ১টি রাস্তার নাম ফেলানী সরণী করার জন্য তারা ৬ জানুয়ারি সোমবার সকাল সাড়ে ১০ টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এ একটি স্বারকলিপি প্রদান করেছেন।

৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার সাড়ে ১০ টায় বিশ্বব্যাপী ফেলানী দিবস পালনের দাবিতে নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের সভাপতিত্বে তোপখানা রোডস্থ নির্মল সেন মিলনায়তনে তারা এক আলোচনাসভার আয়োজন করেছেন। সেখানে উপস্থিত থাকবেন ২০০১ সালের ১৮ই এপ্রিল রৌমারীর বড়াইবাড়ী সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশ ঢুকে বিডিআর ক্যাম্প আক্রমণের চেষ্টা প্রতিরোধীকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে আহ্বায়ক শামসুদ্দীন জানান গত কয়েক বছর থেকে তারা এদিনে এ কর্মসূচী পালন করে আসছেন। তাদের দাবি ৭ জানুয়ারি বিশ্বব্যাপী ফেলানী দিবস পালন, ফেলানী হত্যাকারী বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের ফাঁসি, ফেলানীর পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান, কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তের নাম ফেলানী সীমান্ত নামকরণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পার্ক রোড অথবা কুটনৈতিক এলাকায় ১টি রাস্তার নাম ফেলানী সরণী, সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও সার্বভৌমত্ব লংঘন বন্ধ।

তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবর বিশ্বব্যাপী সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও ৭ জানুয়ারি ফেলানী দিবস পালনের জন্য ২০১৫ সালে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছিলাম। পরবর্তীতে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় এটি বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘের সদস্য যে কোনও রাষ্ট্রকে প্রস্তাব আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট কোচবিহার জেলার বিএসএফের ১৮১ সদর দপ্তরে স্থাপিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যার বিচারকার্য শুরু হয়। ৫ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে। রায় প্রত্যাখ্যান করে ১১ সেপ্টেম্বর ফেলানীর বাবা ভারতীয় হাই কমিশনের মাধ্যমে সে দেশের সরকারকে ন্যায় বিচারের আশায় পত্র দেন। আবারও ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনঃবিচার কার্যক্রম শুরু হলেও বিভিন্ন কারণে তা একাধিকবার স্থগিত হয়।

এছাড়া ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফেলানী হত্যা ঘটনায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ১ম ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবি সমিতির নির্বাহী পরিচালক এ্যাডভোকেট সালমা আলী ২য় বাদী হয়ে আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয় (ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া) এর সচিব এবং বিএসএফ এর মহাপরিচালককে বিবাদী করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নয়াদিল্লীতে ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী একটি ফৌজদারী মামলা করেন। তারা ২০১৫ সালের ২১ জুলাই ফেলানীর বাবার জন্য অন্তবর্তীকালীন ক্ষতিপুরণ চেয়ে আরও একটি আবেদন করেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী এ্যাডভোকেট সালমা আলী মুঠোফোনে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণসহ স্বচ্ছ বিচার না পাওয়ায় ওই মামলার একজন বাদী হিসেবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আশা করছি আমরা কাঙ্খিত বিচার পাবো।’

পরে ২০১৫ সালে আইন ও শালিস কেন্দ্র এবং ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ আরও একটি ক্ষতিপুরণ মামলা করে। ৩১ আগস্ট ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সেদেশের সরকারকে ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপুরণ হিসেবে ৫ লক্ষ রূপী প্রদানের অনুরোধ করেন। এর জবাবে সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামকে দায়ী করে বক্তব্য দেয়। এরপরে ২০১৬ এবং ১৭ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি শুনানি দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি এখনও।

ফেলানী হত্যা মামলার বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য মানবাধিকার কর্মী, কুড়িগ্রাম জেলা জর্জ কোর্ট পাবলিক প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টে বিচারাধীন ফেলানীর পরিবারের পক্ষ থেকে আনিত রিটে বিভিন্ন প্রতিপক্ষ ইতিমধ্যে জবাব দাখিল করেছেন বলে জেনেছি। ফলে আমি মনে করি এখন রিটটির চুড়ান্ত শুনানি হতে পারে।’

Comment As:

Comment (0)