Bangladesh people’s  news
কী ছিল সাকিব জুয়াড়ির হোয়াটসঅ্যাপ আলাপে
Monday, 28 Oct 2019 11:00 am
Bangladesh people’s  news

Bangladesh people’s news

‘আমরা কি কাজটা এখানে করব, নাকি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব?’ জুয়াড়ি আগারওয়াল এভাবেই ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন সাকিবকে। বাংলাদেশ তারকা তাতে সাড়া না দিলেও চালিয়ে গেছেন কথা।

তিনদফা জুয়াড়ির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে সাকিবের বার্তা আদান-প্রদানের ছোট্ট একটি অংশ উপরের লাইনটি। নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের কাছে থাকা সকল প্রমাণের বিস্তারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে আইসিসি। সেখানেই উঠে এসেছে নানা সময়ের আলাপচারিতা।

দীপক আগারওয়াল, একজন ভারতীয় জুয়াড়ি, আইসিসির কালো তালিকাভুক্ত জুয়াড়ি। যার কাছে একাধিকবার ফিক্সিংয়ের বা অনৈতিক প্রস্তাব পাওয়ার পরও আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটকে (আকসু) জানাননি সাকিব।

এমনকি আগারওয়ালের সঙ্গে সাকিবের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা চালাচালির যে প্রমাণ হাজির করেছে আইসিসি, তাতে দেখা যাচ্ছে সাকিব ওই জুয়াড়ির সঙ্গে নিয়মিত কথা চালিয়ে গেছেন। জুয়াড়ির সঙ্গে আলাপের কিছু বার্তা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটবক্স থেকে মুছেও দিয়েছেন তিনি, আর ওই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ তারকা!

আইসিসির তদন্ত ও সাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদের পর সংস্থাটি যা প্রকাশ করেছে-

নভেম্বর ২০১৭
৪ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর, ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে বিপিএলের পঞ্চম আসরে খেলছিলেন সাকিব। সেসময় তারই ঘনিষ্ঠ কেউ আগারওয়ালকে সাকিবের মোবাইল নম্বর দেন। নভেম্বরের মাঝামাঝি একদিন, জুয়াড়ির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা চালাচালি করেন সাকিব। তখনই তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন আগারওয়াল।

জানুয়ারি ২০১৮
সেবছর জানুয়ারিতে ঘরের মাটিতে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। সেই টুর্নামেন্টের সময় আবারও আগারওয়ালের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকদফা বার্তা আদান-প্রদান হয় সাকিবের।

১৯ জানুয়ারি ম্যাচসেরা হন সাকিব। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওই ম্যাচের জন্য তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠান আগারওয়াল। এক পর্যায়ে লেখেন, ‘আমরা কি কাজটা এখানে করব, নাকি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব?’

এই ‘কাজ’ বিষয়টাকে আইসিসি বলছে দলের ভেতরের খবর জানার সংকেত। যার মাধ্যমে ভেতরের খবর ফাঁস করার প্রস্তাবকে বুঝিয়েছেন আগারওয়াল। সেই প্রস্তাবের কথা আকসু, বিসিবি বা কোনো মাধ্যমকেই জানাননি সাকিব। যদিও তখন আগারওয়ালের সঙ্গে বার্তা চালাচালি ছাড়া আর কিছুই করেননি তিনি।

চারদিন পর সেই আগারওয়ালের থেকে আবারও বার্তা পান সাকিব। যাতে প্রস্তাব আসে, ‘ব্রো, এই সিরিজে কিছু পেতে পারি?’ এবারও দুর্নীতিবিরোধী কোনো সংস্থাকে অবগত করা থেকে বিরত থাকেন সাকিব।

এপ্রিল ২০১৮
ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে বোলিংয়ের সময় চোটে কোটা পূরণ করতে পারেননি, ব্যাটে তো নামতেই পারেননি, সেই চোট কাটিয়ে সাকিব তখন আইপিএলে। ২৬ এপ্রিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদের জার্সিতে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে নামেন সাকিব। ব্যাটে-বলে সেদিন দারুণ করেছিলেন। সানরাইজার্সরাও জিতেছিল।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সেই ম্যাচের আগে হোয়াটসঅ্যাপে আবারও আগারওয়ালের বার্তা। সানরাইজার্সের একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় ম্যাচটিতে খেলবেন কিনা সাকিবের কাছে জানতে চান তিনি। দলের ভেতরের আরও কিছু খবরের জন্যও বার্তা পাঠাতে থাকেন। সেদিন আগারওয়ালের সঙ্গে বেশ অনেক কথা আদান-প্রদান হয় সাকিবের। যার বেশকিছু বার্তা তিনি পরে মুছে ফেলেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে আইসিসির কাছে স্বীকার করেছেন।

আইসিসি জানিয়েছে, সেদিনের আলোচনার পর আগারওয়ালকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে থাকেন সাকিব। আগারওয়াল একজন জুয়াড়ি হতে পারে বলেও সন্দেহ হয় সাকিবের। কিন্তু সেদিনও তিনি দুর্নীতিবিরোধী কোনো সংস্থাকে বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষকেই কিছু জানাননি।

আগারওয়াল সেদিনের আলাপের একফাঁকে সাকিবের কাছে তার অ্যাকাউন্টের তথ্য জানতে চান। জবাবে সাকিবের দিক থেকে উত্তর ছিল, আগে তিনি আগারওয়ালের সঙ্গে দেখা করতে চান।

পরিক্রমা
আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের কর্মকর্তারা গত ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট সাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিনি আকসুর কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, আগারওয়ালের কাছে কয়েকদফা প্রস্তাব পেয়েও তিনি নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাউকে কিছু জানাননি। সঙ্গে দলের ভেতরের বা কোনরকম তথ্যও ফাঁস করেননি। আগারওয়ালের থেকে কোনো উপঢৌকন বা সুবিধাদিও নেননি।

ইতি বিষণ্ণতা…
কিন্তু আকসুকে না জানানোর ভুলে চড়া মাশুলই দিতে হল সাকিবকে। চড়া মাশুল দিতে হল বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও। দলের সেরা খেলোয়াড়ের দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা মধ্য দিয়ে।

উপসংহার
সাকিব দায় অস্বীকার করেননি। ভুল করেছেন জানিয়ে আইসিসিকে বলেছেন, ‘আমি যে খেলাটিকে পছন্দ করি তা থেকে নিষিদ্ধ হওয়ায় আমি স্পষ্টতই খুব দুঃখিত। তবে পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিবেদন না দেয়ার জন্য আমি আমার দোষ পুরোপুরি মেনে নিয়েছি। আইসিসি, আকসু দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য খেলোয়াড়দের উপর নির্ভরশীল এবং আমি এই উদাহরণে আমার দায়িত্ব পালন করিনি।’

‘বিশ্বের বেশিরভাগ খেলোয়াড় এবং অনুরাগীর মতো আমিও চাই ক্রিকেট একটি দুর্নীতিমুক্ত খেলা হোক এবং আমি আইসিসি, আকসু দলের সাথে কাজ করার প্রত্যাশায় রয়েছি, যাতে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সমর্থন করে এবং তরুণ খেলোয়াড়রা যাতে একই ভুল না করে, যেটা আমি করেছিলাম’ যোগ করেন সাকিব।

বিপরীতে আইসিসির জেনারেল ম্যানেজার অ্যালেক্স মার্শার বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সাকিব আল হাসান একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তিনি অনেকগুলো শিক্ষামূলক অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন এবং আইসিসির কোডের আওতায় তিনি বাধ্যবাধকতাগুলো জানেন। এই পদ্ধতির প্রতিটি বিষয় তার জানা উচিত ছিল।’

‘সাকিব তার ত্রুটিগুলো মেনে নিয়েছেন এবং তদন্তে পুরোপুরি সহযোগিতা করেছেন। তিনি ভবিষ্যতের শিক্ষায় স্বচ্ছতা ইউনিটগুলোকে সহায়তা করার, তরুণ খেলোয়াড়দের তার ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করে খুশি।’

সাকিবের দুই বছরের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একবছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। আইসিসি বলছে, আগামী এক বছর তিনি খেলতে পারবেন না, কিন্তু তিনি যদি সাজার সব শর্ত মেনে চলেন তাহলে তিনি ২০২০ সালের ২৯শে অক্টোবর থেকে মাঠে ফিরে আসতে পারবেন।

যবনিকা
নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পর মঙ্গলবার মিরপুরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাকিব বলেছেন, ‘যেভাবে আপনারা আমাকে সমর্থন করে এসেছেন, বাংলাদেশের সব ক্রিকেট ভক্তরা, বাংলাদেশের সব মানুষরা, বিসিবি, সরকার থেকে শুরু করে মিডিয়া সবাই, আপনারা আমাকে যেভাবে সমর্থন করে এসেছেন, আমার ভালো ও খারাপ সময়ে। আশা করি এই সমর্থনটা থাকবে। আর এই সমর্থনটা যদি থাকে, আমি খুব শীঘ্রই ক্রিকেটে ফিরতে পারবো। এবং, আগের থেকে আরও শক্তিশালী ও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবো। ধন্যবাদ সবাইকে।’

তখন সাকিবের পাশে দাঁড়িয়ে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেন, ‘আমাদের সকলকে এখন সাকিবের পাশে থাকা দরকার। ওর এখন অত্যন্ত খারাপ সময় যাচ্ছে, ওকে আমরা বলতে চাই ভেঙ্গে পড়ার কোনো কারণ নেই। দুর্নীতি দমন ইউনিটকে ও যে সাহায্য করার ঘোষণা দিয়েছে, ওটা করে যাক। আমরা ওর পাশে থাকবো, যখন যেভাবে সাহায্য করা দরকার আমরা করবো, বিসিবি তার পাশে থাকবে। আশাকরি খুব শীঘ্রই সে আমাদের ক্রিকেটে ফিরবে এবং বাংলাদেশকে আরও অনেক বড় অবস্থানে নিয়ে যাবে।’